জুঁই ফুল জেগে থাকে ইতিহাসের ছোঁয়ায়


রূপসা রায়: সে চূড়ায় ওঠার পথে নামা যায় না। হয়তো যে পথ পেরিয়ে এসেছ, সে পথে তাকানো নিষেধ। মাঝপথে নেমে আসা, অসম্ভব। স্বর্গের দরজায় পৌঁছতে চাইলে পিছন ফেরার উপায় নেই। ফিরলেই বিচ্যুতি, যদি সে পথে পৌঁছতে দম বন্ধও হয়ে আসে, অসাড় হয়ে পড়ে শরীর, তবুও উপায় নেই। অবতরণের পথ ভিন্ন। যাই হোক, সেই স্বর্গের চূড়া থেকে কেমন দেখতে লাগে মর্ত্য পৃথিবী, থুড়ি যুদ্ধজীর্ণ হা ক্লান্ত রোম নগরীকে?

কটা গন্ধ। পুরনো বইয়ের গন্ধের মতো। কিংবা খাটের উপর জলচৌকি বিছিয়ে মায়ের সঙ্গে পড়তে বসার মতো। বিবর্ণ সাদা কালো ইতিহাস বইয়ের পাতায় আবছা ছায়া কলোসিয়ামের। হয়তো সে সময়ে ঝকঝকে কোনও টেক্সট বই ছিল না বলেই দেখে দেখে সাধ মিটত না। অন্তরের খুব কাছের বলেই হয়তো উত্তর কলকাতার পুরনো দালান-কোঠার থেকে তার দূরত্ব অনেক বেশি। যে দূরটাকে কোনও দিন ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন দেখে মানুষ। কেউ পারে, কেউ পারে না। আমি পেরেছি। সে আমার অহংকার নয়। বিষাদ। সে বিষাদ গন্ধের, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ইতিহাস বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা বিষাদ।

কলকাতা শহরের শিয়ালদহ স্টেশনের চারপাশটা দেখেছেন কখনও? ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শহরের উদ্বৃত্ত মানুষ। ঠিক তেমনই যেন রোমা তেরমিনি চত্বর। শহরের বুভুক্ষু, উদ্বৃত্ত মানুষের বসতঘর। আদিম সঞ্চয়ন প্রক্রিয়ায় যাদের পূর্বপুরুষের ভাগ ছিল না কোনও। তারা অনাহুতের দল। শহরের পুরাতনী গানের আসরে তারা রাজপথের পাশ ঘেঁষে খঞ্জনী বাজিয়ে চলে যায়। আর তাদের পাশ ঘেঁষে রাজপথ দেখার জন্য পা ফেলি আমরা, ক্ষমতার কেন্দ্রটিকে দেখার বড় বাসনায়, প্রাচীন পৃথিবী যেখানে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রার্পিত হয়ে, হয়তো ভাবীকালেরই অপেক্ষায়।

শহরের বুকে কালের ছাপ পড়ার কথা ছিল। পড়েওছে। কিন্তু চকচকে বর্তমান ঢেকে ফেলেনি প্রাচীনের সেই বিষাদ-গন্ধ। কবলস্টোনের রাস্তার পাশে ফুটপাথ ধরে হাঁটলে মিঠে গন্ধ নাকে আসে। লোকে বলে, জুসমিন। বিয়াঙ্কা জুসমিন। সাদা জুঁই। সেই গন্ধই শুয়ে থাকে সারা শহর জুড়ে।

আগুন লেগেছিল রোমে। আর পুড়ে যাচ্ছিল রোম। প্রাচীন রোমক-সভ্যতার গ্ল্যাডিয়েটরের খেলা থেকে উঠে আসে স্পার্টাকাস। আকাশপটে রোমের ভাঙা কলোসিয়াম একটা ধার দেওয়া কাস্তের চেহারা নেয়। আমাদের কলকাতার পুরনো ঘরবাড়ির নোনাধরা দেয়ালের তাকে হলুদ মলাটের হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পার্টাকুস বইটার কথা মনে হয়। সেই যে প্রাচী সিনেমার গা ঘেঁষে লরেটো স্কুলের উঠোনে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে— উদ্বৃত্ত শিশু আর এতোল-বেতোল দর্শকদের মধ্যেই একটা চেয়ারে চুপ করে বসে আছেন এক বৃদ্ধ, বয়সভারে ন্যুব্জ। অভিনয়-দর্শকের সমভূমিতে উঠে দাঁড়ান একজন। পেশিবহুল সেই চেহারা ঘোষণা করে, ‘এ হল প্রাচীন রোমক নগরী…’ শেয়ালদা ব্রিজের পাশে আঁধার নামা অন্ধকারে উঠে দাঁড়ায় স্পার্টাকাস। তারও তো প্রেমিকা ছিল। স্পার্টাকাসের ক্ষত-বিক্ষত শরীরেও কি প্রলেপ দিয়েছিল সাদা জুঁইয়ের সুবাস?

কলোসিয়াম যে শুধু স্পার্টাকুসের স্মৃতি, তা তো নয়। সে আসলে এক মহাজগতের স্মৃতি। যে জগতে ক্রীড়া, ক্রীড়নকের আশ্চর্য দ্বন্দ্ব, আর সেই দ্বন্দ্ব থেকেই উৎসারিত বিনোদন। মহাকাব্যের জগৎ সম্পর্কে একদা লিখেছিলেন মার্ক্স, সে জগৎ মানব সভ্যতার শৈশবের, তাই বার বার ফিরে ফিরে যাওয়া তার কাছে। তার রাগ, দুঃখ, অভীপ্সা, লোভ বড় তীব্র, বড় নিরাবরণ। এ কথা সত্যি, রোমে তখন চলে এসেছে রাষ্ট্রের ধারণা, এবং রাষ্ট্রের চিহ্নমতে ভাগ হয়ে গেছে রাষ্ট্রের মানুষ। উদ্বৃত্ত মানুষের শ্রমে তৈরি হবে ইতিহাস, অথচ দুর্ভাগ্য কী, ভাবী কাল তাকে জানবে শাসকের ইতিহাস বলে।

শ্রেণির সুবাদে আমিও তাদের মতোই। কলোসিয়াম দেখার রোমাঞ্চে মোবাইল ফোন থেকে ছবি তুলে পাঠাই ছেলেবেলার জলচৌকিকে। সাদা-কালোর কলোসিয়ামের আবছায়া মূর্ত চোখের সামনে, সভ্যতার ইতিহাস দেখতে গিয়ে সে দেখে ফেলে রক্ত ঘামের ইতিহাস। পাশেই রোমান ফোরাম বা রোমানিয়াম। প্রাচীন রোমান সভ্যতার প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে ইতিউতি।

ইতিহাসের এই রাজপথের ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে নগরজীবন। তার কাল অন্য, তার বীক্ষা অন্য।

ইতালিয়ান কফির মৌতাতে ম ম করে চারপাশ। সমকাল জেলাতো চেখে দেখে। লাল, সবুজ, নীল জেলাতো চাখতে চাখতে অতীতের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়।

যখন পৌঁছেছিলাম এ শহরে, তখন বাজে দুপুর দুটো। ভেবেছিলাম, ঘরে ঢুকেই ব্যাগপত্তর রেখে এক দৌড়ে বেরিয়ে পড়ব রাস্তায়। হল না। ব্যবহারিক জটিলতায় আটকে থাকতে হল বেশ কিছুক্ষণ। বেলা চারটেয় বেরিয়ে আর কতটুকুই বা দেখাশোনা হয়?

মেয়েটা অপেক্ষা করেছিল। মাথা ভর্তি জটা, ছোটখাটো চেহারা, ফিনফিনে পোশাক উড়ছে, চোখের পাতায়, ঠোঁটের নীচে ঝুলছে দুল, আর ঝুলছে সিগারেট, বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে গজোল্লা করছিল।

মেয়েটা আর আমি, একই বয়সী। লেখাপড়া করছে সে, ফাঁকে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দেবার এক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে। ও কর্মচারী মাত্র। যা ভাড়া ওঠে, তারই খানিকটা কমিশন পায়। পাশেই একটা কোয়ার্টারে মা আর বোন। বাবা ছেড়ে গেছে অনেক দিন হল। ছোট ফ্ল্যাটে জায়গায় কুলোয় না, তাই বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে থাকার জন্য ভাড়া নিয়েছে আর একটা ফ্ল্যাট।

তো যা বলছিলাম, ফোনে যোগাযোগ হয়নি বলে বুকিং বাতিল করে দিয়েছিল মেয়েটা। তাই আমরা পৌঁছনোর পরে অকুস্থলে আমরা, সেও। তড়িঘড়ি ব্যবস্থা করে দিল, অন্য একটি অ্যাপার্টমেন্টের। ঘর দেখালেন যে মহিলা, তিনি অবশ্য একটু বয়স্ক। ভ্যালেরিয়া মানে আমাদের এই রোমের মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল ঠায়ে, যতক্ষণ না ঘরদোরের ব্যবস্থা পাকা হচ্ছে আমাদের। ঘর রেডি হতেই বলে গেল, তা হলে চললুম আমি। আমার জন্য এতটা দেরি হল তোমাদের। খুব খারাপ লাগছে। যদি কোনও কাজে লাগতে পারি বোলো, আই ওয়ান্ট টু ডু সামথিং গুড টু ইউ।— এমন স্বাভাবিক সৌজন্য দেখে চমকে এলাম। এ দেশে তো আর এ সবের তেমন বালাই নেই!

পরের দিন যাব ভ্যাটিকান। প্রাচীন রোমনগরীর মতোই সুপ্রাচীন। শুধু তো ধর্মীয় স্থান বলে নয়, এ ভ্যাটিকান শিল্পেরও তীর্থ।

আবারও সেই বিষাদ-ঘ্রাণ।

মা মেরির কোলে যিশুর মৃতদেহ। পুত্রহীনা মায়ের শোক উপচে পড়ছে মেরির মুখে। ব্যাসিলিকার ছাদে পুত্র-বিচ্ছিন্ন পিতা হাত বাড়িয়ে রয়েছে তার দিকে। দুটো আঙুল পরস্পরকে ছুঁতে চায়। তবু হয়তো কিছু ফাঁক রয়ে যায়। ভ্যাটিকানের দরজায় প্রহরারত রাজকীয় প্রহরীর চোখের পাতা পড়ে না। ধর্মক্ষেত্র কখন যেন প্রশাসনিক ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বাঁকানো সিঁড়ি চলে গিয়েছে চূড়ার গায়ে। সে চূড়ায় ওঠার পথে নামা যায় না। হয়তো যে পথ পেরিয়ে এসেছ, সে পথে তাকানো নিষেধ। মাঝপথে নেমে আসা, অসম্ভব। স্বর্গের দরজায় পৌঁছতে চাইলে পিছন ফেরার উপায় নেই। ফিরলেই বিচ্যুতি, যদি সে পথে পৌঁছতে দম বন্ধও হয়ে আসে, অসাড় হয়ে পড়ে শরীর, তবুও উপায় নেই। অবতরণের পথ ভিন্ন। যাই হোক, সেই স্বর্গের চূড়া থেকে কেমন দেখতে লাগে মর্ত্য পৃথিবী, থুড়ি যুদ্ধজীর্ণ হা ক্লান্ত রোম নগরীকে?

মনে পড়ে যায় ফ্লোরেন্সের ডেভিডের কথা। রোমের দিকেই তো চেয়েছিল সে। সে দৃষ্টিতে ভয়ের ছাপ। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা অশনি-সংকেতের মধ্যে ফ্লোরেন্সের বিপর্যয় ঠেকাতে চেয়েছিল সে। তার চোখে বিপর্যয়ের আশঙ্কা, শরীর ত্রস্ত, খানিক দিশাহারা, তবু দেখে নেওয়া অপরপক্ষকে। সন ১৫২৯। প্রিন্স অফ অরেঞ্জ এসে পৌঁছেছেন রোমে। পোপ তাকে অর্থ দিয়েছেন, শর্ত ফ্লোরেন্স আক্রমণ করতে হবে। ১৫২৯ এর ২৪ অক্টোবর থেকে ১৫৩০ এর ১০ অগস্ট, অবরুদ্ধ ছিল ফ্লোরেন্স। তার পর, ফ্লোরেন্সের পতন এবং শাসক হলেন আলেসান্দ্রো দে মেদিচি ফ্লোরেন্সের শাসক।

ডেভিড তৈরি হয়েছিল ১৫০১ থেকে ১৫০৪-এর মধ্যে। মিকালেঞ্জেলো কি আঁচ করতে পেরেছিলেন অনাগত ভবিষ্যৎ?

সে যাই হোক না কেন, আজ যখন রোমা আর ফিরেঞ্জে একই দেশের অন্তর্গত, তখন হয়তো এই যুদ্ধদীর্ণ অতীতকে ভাবা একটু কষ্টকর। কিন্তু শ্রেণিদ্বন্দ্বের ইতিহাস, ভ্যাটিকানের ইতিহাস, ক্যাথোলিক খ্রিস্টবাদের ইতিহাস— এ সব নিয়েই তো রোম। যার প্রতিস্পর্ধী মধ্যযুগীয় আলোকায়ন। সেই আলোকায়নের দ্বন্দ্বকেও তো ধারণ করেছে ভ্যাটিকান। পুরাতনি বাইবেলিয় আখ্যানকে আবারও মানবিক করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। তাই তো পিয়েতা, তাই তো ফাদার অ্যান্ড সান। স্বর্গে পৌঁছনোর যাত্রাপথে প্রতি মুহূর্তে স্খলন, আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু।

তবুও সেই মৃত্যু, শোক আর হিংসার মধ্যেই সভ্যতার অনন্তকেই হয়তো ধরে থাকে রোম। তাই তার সুপ্রাচীন স্থাপত্য ঢাকা পড়ে না আধুনিক পণ্যরাজির বিজ্ঞাপনে। মুখ ঢাকে না সে।

কোথাও নাটক হবে, তার বিজ্ঞাপন। বিলাসবহুল অন্তর্বাসের সদম্ভ ঘোষণায় যৌনতার উদ্ভাস। তবু কী আশ্চর্য, বিসদৃশ ঠেকে না। মনে হয় না পণ্যবাহী সভ্যতা গিলে খেতে চাইছে তার ইতিহাসকে। রাস্তা দিয়ে মিছিল যায়। সেই মিছিলে নানা রঙের মেলা, বহু পোশাকের রংমিলান্তিতে শরীর সঞ্চালন। পিছনে ড্রাম বাজে। এই হাসি আনন্দ উচ্ছ্বাস— এ সবের টুকরো টাকরা নিয়েই তো জীবন, যে জীবনে সন্ধের খাবার টেবিলে সাদা জুঁইয়ের গন্ধ পাওয়া যায়। যেভাবে আমাদের উত্তর কলকাতার গাড়ি বারান্দাগুলিতে সময় থমকে থাকে, শীতের রোদ পড়ে আসলে বহু বহু বছর পারের কথা মনে আসে, সেই রকমই হয়তো। জুঁই ফুলরা জেগে থাকে।

শব্দ: রূপসা রায়


লেখকের পরিচয়: পেশায় সাংবাদিক রূপসা পছন্দ করেন বই পড়তে। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো তাঁর পঠিত স্মৃতি তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বিছানায় বন্ধ করে ফেলে আসা বইয়ের পাতা সেখানেও তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। পথের মাঝে রূপসা আবার পড়তে বসেন নতুন করে।

Email: rupsaray2009@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *