গঙ্গা থেকে চিনশা ৯: অবশেষে মায়া পাহাড়

 


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘চিনের চরম উত্থান পতনের ইতিহাসে তাই ঈ- রা কালজয়ী। এই হান প্রভুত্বের যুগেও মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে তারা। আমার মনে হয়, আজও স্বচ্ছন্দে ম্যাপে তালিয়াং শানের ওপর লিখে দেওয়া যায়, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঈ’’

 

কঘণ্টা হাঁটার পথ দুভাগ। কোনটা আমাদের নিয়ে যাবে চি-ত-ক ভাবছি এমন সময় দূর থেকে আওয়াজ শোনা গেল। লি শিফু-ও পাল্টা জবাব দিতে লাগল। বুঝলাম আমাদের সঠিক পথে তার গ্রামে নিয়ে যেতে আসছে হ লাওশি-র সেই ছাত্রের কাকা ‘লু’। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে এল আমাদের ঈ গ্রামের অভিভাবক। প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেল মানুষটাকে। চলন, মুখভঙ্গি, শরীরের ভাষা, এবং সবার ওপর হাসির সঙ্গে হান দের বিন্দুমাত্র মিল নেই। বরং মিল রয়েছে তিব্বতি এবং বার্মার মানুষের সঙ্গে। লু-র দেখানো সুঁড়ি পথ বেয়ে দ্রুত চড়াই ভেঙে চললাম আমরা তিন জন। কাও শান থেকে ঠিক দু ঘণ্টা চলার পর পৌঁছে গেলাম চি-ত-ক। কিন্তু এ কোথায় এলাম। এ তো অবিকল আমার হিমালয়। গাছপালা, গ্রামের বাড়ি সবেই কি অদ্ভুত মিল! গ্রামের চারদিক জুড়ে চাষের জমি, মূলত আলু এবং মাখা। ‘মাখা’ হল এক ধরনের ক্যাশ ক্রপ যা চড়া দামে বিক্রি হয় লিচিয়াং-এর বাজারে। শক্তিবর্ধক জড়িবুটির অনন্ত চাহিদা চিনাদের। আলু আর মাখা-র জমি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠেছে। ক্ষেতের সীমানায় শুরু পাইন গাছের জঙ্গল। আর তারও ওপরে এক পাহাড়ের শ্রেণী। চলে গেছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। সামনের ঘন সবুজ অরণ্যে ঢাকা পাহাড়ের মাথার পিছন থেকে উঁকি মারছে আরও কিছু পাহাড়ের দল। এই পাহাড়গুলোর মাথায় তুষারের চাদর। মানচিত্র পড়ার কল্যানে আমি জানি ওই তুষারের পাহাড় শ্রেণী যেখানে শেষ সেখান থেকেই আবার গভীর নদীখাতে ঝাপ দিয়েছে এই জমি। চলে গেছে চিনশার দ্বিতীয় বাঁকের গহনে। কিন্তু কেবল মানচিত্রে দেখলে তো আর শূন্যস্থান পূরণ হয় না। তাই আমাকে যেতে হবে ঐ পাহাড় টপকে একেবারে তার শেষ প্রান্তে। ছবি তুলতে হবে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের। হিসাব করতে হবে তার উচ্চতা। যাচাই করে জেনে নিতে হবে আরও কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছে তালিয়াং শানের এই অদৃস্টপুর্ব পাহাড়গুলো। তবেই হবে আমার মায়া পাহাড়ের খোঁজ সম্পূর্ণ।

লু-র বাড়ি ঠিক গ্রামের মাঝখানে। যেতেই দেখি আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে লু এর দাদা। তিনিই এ গ্রামের মোড়ল। কাও হান থেকে আমাদের ফোনের খবর লু পেতেই গোটা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গেছে এই বিদেশির আগমন বার্তা। মোড়ল জানতে চাইলেন আমার পরিকল্পনা। আমি বার করলাম আমার ম্যাপ এবং সেই স্যাটেলাইট ইমেজ। বললাম, আমার ইচ্ছে এই পাহাড়ের শ্রেণীর উত্তরতম বিন্দুর এক পাহাড় চুড়ায় উঠবো। আরও বললাম, তবেই আমার পক্ষে বাকি রেঞ্জটার সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা সম্ভব হবে। আর সেই প্রত্যক্ষ ধারণা না থাকলে আমি বাকি বিশ্বের কাছে এই পাহাড়ের খবর পৌঁছে দেব কী করে? খুশি মনেই আমার আবদার মেনে নিলেন মোড়ল। বললেন, যতদিন খুশি এই গ্রামে থেকে আপনার কাজ করে জান। জঙ্গলের পথ চেনে এমন একজনকে কাল থেকে আপনার সঙ্গে পাঠিয়ে দেব। আপনার সুবিধেই হবে তাতে।

একটু পরেই লু-র স্ত্রী এবং কন্যাও এসে গেল বাড়ি। দেখলাম, লু কিংবা গ্রামের অন্য পুরুষেরা সাধারণ শার্ট-ট্রাউজার পরে থাকলেও, শ্রীমতী লু-র পরনে এক অদ্ভুত সুন্দর পোশাক। মনে পড়ল এই পোশাকের কথাই তো গোলার্ট লিখেছিলেন। ঈ মহিলাদের তুলনা গোলার্ট করেছিলেন রেনেসাঁ যুগের ইতালিয়ান উচ্চবংশীয় রমণীদের সঙ্গে। বলেছিলেন, আচারে, ব্যবহারে এই ঈ উপজাতি প্রাচীন স্পার্টা-র অধিবাসীদের মতো। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে অকুতোভয় যুদ্ধ পারদর্শিতা, সব দিকেই সেই প্রাচীন স্পার্টা-র মানুষের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন পিটার গোলার্ট। প্রথমে নাশি, তারপর মঙ্গোল, এবং শেষে হান, কারওরই সামনে মাথা নোয়ায়নি এই ঈ ট্রাইব। চিরকালই নিজেদের সমাজের মুলস্রোত থেকে সরিয়ে, এই তালিয়াং শানের পাহাড়ে নিজেদের ঘর বেঁধেছে তারা। আর তাদের কেউ আক্রমণ করতে এলে তাকে নৃশংস ভাবে ছিঁড়ে ফেলতেও এক মুহূর্ত দ্বিধা করেনি সে। তাই এই সেদিনও, তালিয়াং শানের এই পার্বত্য অঞ্চলের মানচিত্রে লেখা থাকত কেবল একটাই কথা, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট লোলোস’, ‘স্বাধীন লোলোদের এলাকা’।

সন্ধ্যা নেমে আসছিল। লু পরিবারের ইয়াক, গরু, শূয়র, কুকুর, ঘোড়া সবাই যে যার আস্তানায় ফিরছিল। দূরে হা-পা রেঞ্জ বিদায় জানাচ্ছিল আরও একটা দিনকে। যেমন সে করে এসেছে প্রত্যহ, বিগত কয়েক হাজার বছর ধরে। লু পরিবার প্রস্তুত হচ্ছিল আরও এক রাতের জন্য। লু গিন্নি রাঁধছিলেন কস্তুরি হরিণের মাংস আর আলুর সুপ। লু বলছিল, তার বিদেশি অতিথির ভাগ্য খুবই ভালো বলতে হবে। মাত্র দুদিন আগেই কস্তুরিটাকে মেরেছে সে। তাই তো খাওয়াতে পারল আজ। আমি ভাবি, পুর্ব পুরুষদের মতো লু পরিবারকে আর শিকার করে খেতে হয় না। প্রস্তুত থাকতে হয় না হানাদার কোনও সেনা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার জন্য। নতুন চিনকে চিনে নিয়েছে সে। আজ সে ক্ষেত খামারের মালিক। আজ সে খবর রাখে লিচিয়াং-এর বাজারে আলু এবং মাখা-র দর। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বদলে নিয়েছে ঈ। শিকার আজ তার নেহাতই শখের, পছন্দের খেলা। তাই নিজেকে বদলে, সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অর্থ পরাধীনতা নয়। স্বাধীনতার শর্তগুলো বদলে যায় সময়ের সরণী বেয়ে। সেই বদলে যাবার ভাষা শিখে নিতে পারে যারা, তারাই টিকে থাকে। আর মুছে যায় তারা যারা আপোস কিংবা রুখে দাঁড়ানো, কোনওটাই ঠিক মতো করে উঠতে পারে না। চিনের চরম উত্থান পতনের ইতিহাসে তাই ঈ- রা কালজয়ী। এই হান প্রভুত্বের যুগেও মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে তারা। আমার মনে হয়, আজও স্বচ্ছন্দে ম্যাপে তালিয়াং শানের ওপর লিখে দেওয়া যায়, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঈ’।

 

এর পরের তিনদিন, চি-ত-ক-র সেই পাহাড়ের রেঞ্জ ঘুরে বেড়াই আমি। পথ খুঁজে বার করার  অনাবিল আনন্দে আরোহণ করি দুটি শিখর এবং পার হই তিনটি গিরিপথ। অভিযানের শেষে ঠিক করি এই পাহাড় শ্রেণীর নাম রাখব ‘চি-ত-ক শান’। ঈ গ্রামের নামটাই না হয় লেখা থাক পাহাড় গুলোর গায়ে। অভিযানের চিরন্তন এক হাতছানিতে যে মায়া পাহাড়ের খোঁজ শুরু হয়েছিল, সেখানে পৌঁছে ছিলাম একটু একটু করে, ভূগোল, রাজনীতি, সংস্কৃতি, মানুষ এবং তার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে হেঁটে। আমার কাছে অভিযানের অঙ্গ এরা সবাই, আর তবেই তো সেই অভিযান সর্বাঙ্গীণ। আর হ্যাঁ, একেবারে শেষদিন উঠে দাঁড়াই সেই পর্বতমালার উত্তরতম শিখরের শীর্ষে। দেখতে পাই অনেক গভীরে এক আবছায়া গিরিখাতে বয়ে যায় চিনশা। সেই মুহুর্তে, তার গর্জন শুনতে না পেলেও, তার গভীর, গাম্ভীর্য  অনুভব করতে পারি আমি। এক সেতু তৈরি হয় উচ্চতা থেকে গভীর গহনে। মাইক ডোবি-র দূর থেকে দেখা সেই শিখর, একসময় আমার মনের মানচিত্র জুড়ে মায়া পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, তারই শীর্ষে নিশ্চল, নীরব আমি। ঝড় আসার আগের শেষ কয়েকটা মিনিট যে আমার একান্ত নিজের।

লেখকের মন্তব্য: তিনদিন ধরে পাহাড়ের বিভিন্ন শিখর এবং গিরিপথ এক্সপ্লোরেশন করার বিবরণ এই প্রবন্ধে আমি বিশদে লিখিনি। আমি মনে করি এক্সপিডিসন রিপোর্ট লেখার প্ল্যাটফর্ম এই পত্রিকা নয়। যদি একান্তই পাঠক এই এক্সপ্লোরেশনের পাহাড়ি খুঁটিনাটি জানতে চান তাহলে কষ্ট করে তাঁদের আমেরিকান অ্যালপাইন জার্নালের এই লিঙ্কটিতে যেতে হবে:

www.publications.americanalpineclub.org/articles/13201213232/Jidege-Shan-Exploration

এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের ঋণস্বীকারঃ

১- জন কি, ‘চায়না- এ হিস্ট্রি’

২- রামচন্দ্র গুহ- ‘মেকার্স অফ মডার্ন এশিয়া’

৩- থান্ট মিন্ট উ- ‘হোয়ের চায়না মিটস ইন্ডিয়া’

৪- পিটার গোলার্ট- ‘ফরগটেন কিংডম’

৫- টাইমস ম্যাগাজিন- জুন ২০১৫, পৃষ্ঠা- ২৬-২৯

৬- দি ইকনমিস্ট- ৭ মার্চ ২০১৫, ‘গো স্লো’, পৃষ্ঠা-২৯

৭- উইকিপিডিয়া

৮- হেরম্বচন্দ্র ভট্টাচার্য- ‘বিশ্বের ইতিহাস ১৮১৫-১৯৩৯’

৯- দি হিন্দু- ২৪ মার্চ, ২০১২- ‘৮৮ ইয়ার্স লেটার টেগোর কামস টু চায়না এগেন’

১০- এ এফ পি- ২৫ আগস্ট, ২০১৪

১১- রস টেরিল- ‘৮০০,০০০,০০০-দি রিয়েল চায়না’

১২- জিবি টাইমস ডট কম- ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩- ‘ইউনান প্রভিন্স সাফারিং মেজর ড্রাগ ট্রাফিকিং প্রবলেম’

১৩- আমেরিকান অ্যালপাইন জার্নাল- সঙ্খ্যা-৫৪

১৪- চার্লস অ্যালেন- ‘এ মাউন্টেন ইন টিবেট’

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

2 thoughts on “গঙ্গা থেকে চিনশা ৯: অবশেষে মায়া পাহাড়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *