গঙ্গা থেকে চিনশা ৮: কোথায় চি-ত-ক


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘এতদিন ধরে গুগল আর্থে দেখার পর আমার চিনতে দেরি হয় না। আমি বুঝতে পারি, পৌঁছে গেছি আমার সেই কাঙ্ক্ষিত মায়া পাহাড়ের পায়ের কাছে’

লিচিয়াং এ তিনটে দিন কেটে গেল দ্রুত। অভিযানের তোড়জোড় বা পরিকল্পনা, লিচিয়াং পৌঁছে সেরকম কিছুই করার ছিল না। মানে লোকলস্কর জোগাড়, প্রচুর খাবারদাবার কেনা, মালপত্র প্যাকিং, এই জাতীয় কাজ কর্মের কথাই বলছি। যা কিছু হোম ওয়ার্ক সে তো আগেই করা হয়ে গিয়েছিল। আমার প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল গুগল আর্থে দেখা সেই গ্রামে পৌঁছনোর পথের সন্ধান করা। তারপর, সন্ধান পেলে সেখানে কীভাবে পৌছনো যায় সেটা ছকে ফেলা। সেই মতলবে গুগল আর্থ থেকে নেওয়া প্রিন্ট আউট দেখিয়ে বেড়াই লোক বুঝে। গ্রামের নাম চি-ত-ক ( ইংরাজি ফিন ইন হরফে ‘ Jidege’)। ঘাড় নাড়ে সবাই। একে আমার যৎকিঞ্চিত ম্যান্ডারিনের ঝুলি তার ওপর টুরিস্ট সার্কিটের বাইরের একটা শব্দ। ওদের আর দোষ কোথায়!

 

লিচিয়াং যারা ঘুরতে আসেন তারা নব্বই শতাংশই হান, আর সকলেই খোঁজ করেন হাতে গোনা কয়েকটা জায়গার। প্রথমে টাইগার লিপিং গর্জ, তারপর শাংরি লা। খুব উৎসাহী ট্রেকার কিংবা ক্লাইম্বার হলে হা-পা এবং ইউলং শু শান। আর একটু অফ-বিট ট্রাভেলারের জন্য পাও শান এবং লু-কু লেক। অবশ্য, এটাই সারা পৃথিবী জুড়ে সাধারণ টুরিস্ট মানসিকতা। ভাগ্যিস এই মানসিকতা আছে! না থাকলে তো বিশ্বের কোনও মানচিত্রেই আজ একফালি শূন্যস্থান খুঁজে পাওয়া যেত না। একে ট্যুরিজম ধারণাটাই এখানে নতুন, তার ওপর, পর্যটন বিভাগের লোকই বলুন বা, কোনও হোটেলের কর্মচারী, সকলেই তো বহিরাগত হান! ফলে, টুরিস্ট অফিস থেকে ট্যাক্সি ড্রাইভার, সকলেরই এ অঞ্চলের ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত।  আমার ব্যাকপ্যাকার হোস্টেলেও এমন নাম কেউ শোনেনি। তবে এই সব হোস্টেল জাতীয় জায়গায় মূলত ইংরাজি বলা লোকজন থাকে বলে আমার একটা বাড়তি সুবিধা ছিল এবং সেকারণেই এখানে রাত কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। সেই পরিকল্পনা জলে গেল না। হোস্টেল এর ম্যানেজার রিভার এবং তার সহকর্মী অ্যালেন একরকম চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে আমার সঙ্গে হাত মেলাল ।

রিভারের দেখলাম প্রচণ্ড উৎসাহ আমার দলে ভিড়ে যাবার। আরও অবাক হলাম যখন রিভার বলল, তুমি তো মুখার্জি? তার মানে ব্রাহ্মণ? আর তার মানে সমাজে তোমাদের নিশ্চয়ই ভীষণ প্রতিপত্তি? তাই না? বুঝলাম রিভার আমার নাম নিয়ে রীতিমত গবেষণা করে ফেলেছে। এমনকী, আমার সম্বন্ধে তার জ্ঞান দেখলাম নাম-পদবীর সীমান্ত ছাড়িয়ে আরও বেশ কিছুটা গড়িয়েছে। কিন্তু তা কি কেবলই কৌতূহলের কারণে? এক আগন্তুকের ব্যাপারে রিভারের গবেষণার কারণ বুঝতে আমার আরও কয়েকটা দিন লেগেছিল। কিন্তু সেই মুহুর্তে ওর প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ভারতে বুলেট ট্রেন এখনও চলছে না ঠিকই, তবে জাত-পাতের ব্যাপারটাও চলছে না। জাতের নামে বজ্জাতি থেকে ভারত আজ অনেকটাই মুক্ত। কী করে হল এই অসম্ভব কাণ্ড ভারতে?  আমি বুঝতে পারছিলাম রিভারের ‘ব্রাহ্মণ’ ব্যাপারটায় উৎসাহের কারণ। ওর কাছে ব্রাহ্মণ হল হিন্দু সমাজের উচ্চ বর্ন, আর ও নিজে ‘হান’। আর হানেরা যে কত মহান তার নমুনা তো আগেই দিয়েছি। তাই এক উচ্চবর্নের হিন্দুর সঙ্গে দেখা হচ্ছে বিশ্বের সর্ব শ্রেষ্ঠ জাতি ‘হান’-এর, এ ব্যাপারটা তাকে বিশেষ ফুর্তি যোগাচ্ছিল। ব্যাপারটা অনেকটা হিটলারের সঙ্গে স্তালিনের দেখা হবার মত। এসো দুই বজ্জাতে হাত মেলাই! যাই হোক, আবার জিজ্ঞাসা করে রিভার, তোমাদের দেশে সেরকম কালচারাল রেভলিউশন গোছের কিছু হয়েছে তো শুনিনি? বললাম, রিভার, আমাদের দেশেও হয়েছে রে ভাই, তবে তার নাম ‘রেভলিউশন’ নয় ‘এডুকেশন’, বিপ্লবের নামে লোকের মাথা কাটা নয়, হয়েছে ব্ল্যাক বোর্ডের সামনে বসে শিক্ষা। রামমোহন রায়ের নাম শুনেছ?

 

কথা আর বিশেষ এগোল না, কারণ ততক্ষণে আমার গুগল আর্থ ম্যাপের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে রিভার। এমন জিনিস আগে চোখে দেখেনি সে। ঠিক কোনও নিষিদ্ধ বস্তু চেখে দেখার উত্তেজনা ওর চোখে মুখে। মেনল্যান্ড চিনে নিষিদ্ধ গুগল-এর স্যাটেলাইট ইমেজ নিয়ে তার দোরগোড়ায় হাজির এক ‘ব্রাহ্মণ’ ভারতীয়। বলছে খুঁজতে যাবে চিনশা নদীর দ্বিতীয় বাঁকের কোন এক পাহাড়। ভাবা যায়! ম্যাপে,আমার লক্ষ্য বিন্দু চি-ত-ক গ্রাম সেটা ওকে বোঝালাম। উত্তেজনায় একের পর এক ফোন করতে থাকল রিভার। কিন্তু চি-ত-ক-র নাম কেউই শোনেনি। অগত্যা জিজ্ঞাসা করা হল চি-ত-ক-র পাশের গ্রাম ‘কাও হান’- এর নাম? এবার পাও শানের এক গেস্ট হাউসে ফোন করে পাওয়া গেল একটু আশার আলো। জানা গেল, লিচিয়াং থেকে পাও শান কিংবা লু-কু লেক যাবার পথে মিং ইন বলে একটা গ্রাম আছে। সেখান থেকে কাও হান যাবার একটা রাস্তা থাকলেও থাকতে পারে। তবে রাস্তা আদৌ আছে কি না তা জানতে হলে যেতে হবে মিং ইন। ব্যস, আমি একপায়ে প্রস্তুত। মিং ইন আমাকে নিয়ে যাবে আমার লক্ষ্যের আরও এক ধাপ কাছে। তাই দেরি কিসের?

পরদিনই ওর নিজের গাড়ি মেরামত করে ফেলল রিভার। বলল আমার সঙ্গে যেতে চায়। আর ওর গাড়ি নিলে আমায় কোন ট্যাক্সি ভাড়াও করতে হবে না। কেবল তেলের খরচ দিলেই চলবে। অবাক হলেও আপত্তি করলাম না। ভাবলাম, আর যাই হোক, কথা বলার একটা সঙ্গী তো জুটবে! তাছাড়া ট্যাক্সি ভাড়া বেঁচে যাওয়াটাও কম কথা নয়। রিভার আরও বলল, ওর চেনা এক ভদ্রলোক লি-কে সঙ্গে নিলে সুবিধে হয়। সুবিধে হয় বুঝলাম, কিন্তু কার? রিভারের? না আমার? জবাব পেলাম, লি লোকটা হান হলেও প্রায় তিরিশ বছর আছে লিচিয়াং-এ। ওর স্ত্রী নাশি, ফলে লি, নাশি ভাষা বেশ ভালোই বলতে পারে। আর বলতে পারে ব্ল্যাক লোলো-দের ভাষা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ব্ল্যাক লোলো-রা আছে নাকি? জবাব পেলাম, হ্যাঁ আছে। বিশেষ করে আমি যে অঞ্চলে যেতে চাইছি সেখানে ওদের গ্রাম পাবারই সবথেকে বেশি সম্ভাবনা। তবে খুব সাবধান, ওদের সামনে আবার ব্ল্যাক লোলো বলে ফেল না যেন! আমরা ওদের ডাকি ‘ঈ’ (Yi) নামে। তালিয়াং শানের পাহাড়ে যে ব্ল্যাক লোলোরা থাকত সে কথা তো পিটার গোলার্ট এর বইতেই পড়েছিলাম। তবে ওরা যে এখনও আছে এবং ওদের সঙ্গে আমার দেখা হতে পারে এই ভেবে বেশ রোমাঞ্চ হল। গোলার্ট লিখেছিলেন, একসময় ‘ঈ’ দের ‘লোলো’ বলে সম্বোধন করলে প্রাণ হারানোর সমূহ সম্ভাবনা থাকতো। লোলো কথাটা আসলে অপমানসূচক। অনেকটা ঠিক গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট-দের মতো ব্যাপারটা। ওদের ‘এস্কিমো’ বলে ডাকাটা মোটেই ওরা ভাল চোখে দেখে না। যেমন পছন্দ করে না কালাহারির সান ট্রাইব ওদের হটেনটট বলে ডাকা। এস্কিমো কথার অর্থ কাচা মাংস ভক্ষক, আর হটেনটট কথাটা তো সান-দের ‘টাং–ক্লিকিং’ ভাষাকে ভ্যাঙানো ছাড়া কিছুই নয়। তবে আমাদের ঘরের খুব কাছেই আরও এক উপজাতির সঙ্গে এই নাম বদলে কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। আমরা যাদের লেপচা বলে জানি, তারা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘রংকুপ’ বলে। লেপচা শব্দটা আসলে ‘লাপচে’-র অপভ্রংশ। নেপালিরা রংকুপ-দের ছোট করার উদ্দেশ্যেই ‘লাপচে’ শব্দটার উদ্ভাবন করেছিল। অনেকটা যেভাবে বিহারিদের ‘খোট্টা’ কিংবা ওড়িশার লোকজন কে ‘উড়ে’ বলাটা বাঙালির স্বভাব ছিল আর কি! তবে নেপালি দের মুখের ওপর  ‘ন্যাপলা’ কিংবা নিদেন পক্ষে ‘নেপু’ বলে ডাকার আজ আর কারও বুকের পাটা আছে বলে জানা নেই। বাঙালি অবশ্য গর্বের সঙ্গে নিজেকে ‘বং’ বলে ডাকছে। এটাই তাদের নতুন ঢং। তবে কিছু ‘উড়ে’ এসে এই ‘বং’-দের ‘ব্যাঙ’ বলে ডাকলে শহীদ মিনারের তলায় সভা বসবে কি না তা জানা নেই। হাজার হোক ব্যঙ্গ করার অধিকার তো বঙ্গদেশের একার নয়! যাই হোক, নাম বিভ্রাটের নাভিশ্বাস থেকে এক নিশ্বাসে আবার ফেরা যাক চিনে।

যাই হোক, লি কে দলে নেওয়াই ঠিক মনে হল। হাজার হোক, লোলো সামলাতে গেলে হয়তো লি-কে লেলিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না! রিভার বলল, শুধু লি না বলে একটা ‘শিফু’ যোগ করে দিলে সম্বোধনটা সন্মান পায়। শিফু কথার অর্থ গুরু কিংবা ওস্তাদ গোছের। একে লি-র বয়স সাতান্ন, তায় সে নাশি এবং ঈ ভাষা জানে। এমন লোককে ওস্তাদ বলে ডাকতে আমার কোনও আপত্তি নেই।  তাই লি শিফু আর রবাহূত রিভার কে নিয়ে আমার দল গিয়ে ঠেকল তিন-এ। ড্রাইভারের আসনে বসল লি শিফু। ব্যাগ বস্তা গুছিয়ে আমরা লিচিয়াং ছাড়লাম। দুদিন ধরে মেঘলা আর গুমোট থাকার পর অবশেষে আকাশ কেটে গিয়েছিল। তা তোং ছাড়িয়ে একটু এগোতেই দেখা দিল ইউলং পাহাড়ের রেঞ্জ, যার আর এক নাম জেড ড্রাগন। আর তার পরেই এসে পড়ল পথের ধারে ছোট জনপদ মিং ইন, নাশি-দের বাস। লু-কু লেক এবং পাও শান যাবার পথে বলে বেশ কিছু দোকান পাট গড়ে উঠেছে এখানে। থানা, স্কুল, পোস্ট অফিস এর সঙ্গে অনেকগুলো খাবার দোকান। এরকমই এক খাবার দোকানে আমরাও ঢুকে পড়লাম। উদ্দেশ্য লাঞ্চ এবং তারই সঙ্গে কাও হান যাবার পথের খোঁজ। সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য, দুইই পাওয়া গেল। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা যেতে পারে, মিং ইনের পথের ধারের দোকানে নাশি রান্নার স্বাদ খুনমিং এবং লিচিয়াং এর যেকোনো রেস্তরাঁর থেকে অনেক গুন ভাল সে বিশ্বাস সেদিন আমার হয়েছিল। তবে সেই ভাল লাগাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল তার পরের কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা।

শাংগাওহান-এর লুকনো উপত্যকা

মিং ইন ছাড়িয়ে অনেকটা যাবার পর এক জায়গায় পথ দুভাগ। কোনও রোড সাইন নেই, তাই অনেকটা আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতোই আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে ছোটটা ধরলাম। দুটো বাঁক পার হতেই পিচ ঢালা রাস্তা অদৃশ্য। বদলে রয়েছে কংক্রিট বাঁধানো একটা পাঁচ ফুট চওড়া পথ, একে বেঁকে পাহাড়ের কাঁধ বেয়ে চলে গেছে। কিছুদূর চলার পর চোখের সামনে খুলে গেল এক বিশাল প্রশস্ত উপত্যকা। দেখা গেল ছড়ানো ছিটোনো গ্রামের ঘর বাড়ি। সেই কংক্রিটের পথ যেখানে শেষ সেখানে গিয়ে দেখি একটা স্কুল। আর স্কুলের পাঁচিলের পর থেকেই শুরু হয়েছে এক পাহাড়ের শ্রেণী। এতদিন ধরে গুগল আর্থে দেখার পর আমার চিনতে দেরি হয় না। আমি বুঝতে পারি, পৌঁছে গেছি আমার সেই কাঙ্ক্ষিত মায়া পাহাড়ের পায়ের কাছে।

মিং ইন এলিমেন্টরি স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে লেখক

গাড়ি একপাশে রেখে আমরা ঢুকে পড়ি স্কুলের চত্বরে, উদ্দেশ্য খোঁজ নেব চি-ত-ক-র। আদৌ আছে কি সেই গ্রাম? আর চি-ত-ক র অস্তিত্ব যদি না থাকে, তাহলে আমরা কি পারি না, এই কাও হান থেকেই অভিযান চালাতে? কয়েকটা দিন যদি থাকার ব্যবস্থা হয় কাও হানে, তাহলে এখান থেকেই পাহাড় চড়ার পরিকল্পনা করা সম্ভব। অনেক প্রশ্ন মনে ভিড় করে। লি শিফু আর রিভার কথা বলতে থাকে এক শিক্ষকের সঙ্গে। আমায় ঘিরে ধরে স্কুল পড়ুয়ার দল। চলে ছবি তোলার পর্ব। আমি তার মাঝে লি শিফু আর রিভারের মুখের ভাব ভঙ্গি দেখে বোঝার চেষ্টা করি, আলোচনা কোনদিকে এগোচ্ছে? কিন্তু চিনা লোকের মুখভঙ্গির অনুবাদ করা আর পাথরের ভবিষ্যৎ গণনা করা যে একই ব্যাপার তা হাড়েহাড়ে আবারও টের পাই। অগত্যা শান্ত ছেলের মতো অপেক্ষা করা ছাড়া গতি থাকে না। কিছুক্ষণ পর লি শিফু আর রিভার দুজনই আমার দিকে তাকায়। আমিও তাকাই। আমার চোখে জিজ্ঞাসা, আর ওদের চোখে? সন্ন্যাস- আশা-হতাশার ঊর্ধ্বে সেই দৃষ্টি। রিভার বলে, ভালো এবং খারাপ, দুই সংবাদই আছে। ভালো খবর হল চি-ত-ক গ্রামটা আছে। এই গ্রাম থেকেই ট্রেক করে সেখানে যাওয়া সম্ভব। সাত-আট কিলোমিটার হবে। কয়েক ঘর লোকও আছে সেখানে। হ্যাঁ, ঈ-রাই আছে। আর খারাপ খবর হল, এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। এ গ্রামের লোক অচেনা অতিথি পছন্দ করে না। ইদানীং ড্রাগ বিক্রি করতে আসা মাফিয়ার দলও খুব বেড়ে গেছে। তার ওপর তোমার মতো অদ্ভুত চেহারার লোক এরা এই প্রথম দেখছে। রাতে আমাদের মেরে পুঁতে ফেলবে, আর আমার গাড়ি জ্বালিয়ে দেবে। পুলিস-প্রশাসনের অস্তিত্ব নেই এই তালিয়াং শানে। পুরোপুরি নাশি গ্রাম। অর্ধেক কথা ছাই আমিই বুঝছি না। ভাগ্যিস লি শিফু সঙ্গে ছিল! এই শিক্ষক ভদ্রলোকের লিচিয়াং যাতায়াত আছে তাই এত কথা বলল। হেডস্যার তো তোমায় উঠোনে দেখেই নিজের অফিস ঘরে ঢুকে গেছে! আসলে কেউ রিস্ক নিতে চায় না, বুঝলে না? বুঝলাম, কিন্তু তাহলে এখন কিংকর্তব্য?

একটু ভেবে বলি, চল আজ ফিরে চলা যাক। রাত কাটানো যাক মিং ইন-এ। এখান থেকে তো মাত্র ঘণ্টা দেড়েকের ড্রাইভ! তারপর আগামীকাল সকালে আবার আসা যাবে। নতুন উদ্যমে কথা বলা যাবে গ্রামের মানুষের সঙ্গে। নাশি-র হাতে প্রাণনাশ করে কারওরই লাভ নেই; না হান, না এই বঙ্গসন্তান। মিং ইনে ঘর পাওয়া গেল। ট্রাক ড্রাইভারদের রাত কাটানোর মতো আস্তানা। একটা ঘরেই তিনজন ঢুকে পড়লাম। সারারাত টেলিভিশন দেখল লি শিফু। একের পর এক রিয়েলিটি শো। তাদের মধ্যে একটা আবার অবিকল ‘আমেরিকান আইডল’ এর চিনা সংস্করণ। দেশ মহাদেশ নির্বিশেষে, বোকা বাক্সের এই অসাধারণ বিশ্বজনীনতায় বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। এই তো যথার্থ বোকা বাক্সের সমাজতন্ত্র। পরদিন সকাল হতেই আবার কাও হানের পথে তিন মুর্তি।

কাও হান পৌঁছেই দেখা করলাম সেই শিক্ষকের সঙ্গে। আজ দেখলাম হাসি মুখ। হাসিটা কৃপার না অনুকম্পার তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না। বদলে আমিও এক গাল হাসি ফেরত দিলাম যদি বরফ গলে এই আশায়! শিক্ষকের নাম হ লাওশি। ‘লাওশি’ কথার অর্থ শিক্ষক তো আগেই বলেছি, সেই যে আমার শং লি লাওশি ছিল কলকাতায়, সেরকমই আর কি! যাই হোক, শিক্ষক বললেন, উপায় একটা হতে পারে। যদি চি-ত-ক গ্রামের অধিবাসী কেউ রাজি হয় তার বাড়িতে থাকতে দেবে, আর তাদের গ্রামের পিছনের পাহাড়ের রেঞ্জে কেউ গেলে তাদের আপত্তি নেই, তবেই সেটা সম্ভব। নচেৎ লিচিয়াং ফিরে যেতে হবে আপনাদের। আমি এই প্রস্তাবে রাজি, এই কথা জানাতেই, শিক্ষক হাঁক পাড়লেন। অমনি হুশ করে হাজির এক ছাত্র। তারপরই মোবাইল ফোন নিয়ে কথা বলতে শুরু করল কার সঙ্গে কে জানে? সবাই মনোযোগ দিয়ে চেয়ে থাকল ছাত্রের দিকে। রিভার আমায় বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা। এই ছাত্রের কাকা থাকে চি-ত-ক। তার সঙ্গেই কথা চলছে। আর কাকা রাজি হলেই কেল্লা ফতে। অধীর আগ্রহে কয়েক মিনিট কেটে গেল ফোনালাপে কান পেতে। ফোনটা রেখে শিক্ষককে কয়েকটা কথা বলেই একছুট লাগাল ছেলেটি। আমাদের তিন জোড়া চোখ এবার  হ লাওশির দিকে। শিক্ষক বললেন, রাজি হয়েছেন ছেলেটির কাকা। চি-ত-ক-র দরজা আপনাদের জন্য খুলে গিয়েছে। আপনারা এখনই হাঁটা শুরু করে দিন। আপনাদের হোস্ট মাঝপথেই ধরে ফেলবে। ওর গ্রাম থেকে সে এতক্ষণে নামা আরম্ভ করে দিয়েছে। আর হ্যাঁ, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে কাও হান এবং চি-ত-ক গ্রামে এই ভারতীয়ই হবে প্রথম বিদেশি। ‘হ’ বাবু হাসির অর্থ বোঝা গেল অবশেষে। তাতে মিশে ছিল নতুন বন্ধুত্বের উষ্ণতা। তার হাত মেলানোটাও তাই আজ অনেক স্বতস্ফুর্ত আর জোরদার মনে হল। রিভারের গাড়ি রাখা হল গ্রাম প্রধানের বাড়ির সামনে। পিঠে উঠল রুকস্যাক। আমি ভাবলাম, আজ থেকে এক ‘ঈ’ পরিবারের অতিথি আমি। সম্ভাবনার বিচিত্র রোমাঞ্চে চড়াই ভাঙার কষ্ট অপ্রাসঙ্গিক মনে হল। ট্রেক শুরু হল চি-ত-ক-র পথে।

চি-ত-ক-এ আমাদের হোস্ট মিস্টার লু এবং লি সিফু

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *