গঙ্গা থেকে চিনশা ৬: মেঘ মুলুকের দক্ষিণে


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘গ্রেট ওয়াল ব্যাপারটা ওদের মজ্জাগত যে!  রূপক থেকে বাস্তব, দুই অর্থেই। প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান, দুই ক্ষেত্রেই। কমিউনিস্ট জমানার কড়া পাহারা কিঞ্চিৎ সরে গেলেও আজও আছে এক বিশেষ পাঁচিল। এর নাম ‘দি গ্রেট চাইনিজ ফায়ার ওয়াল’।’

কে মাঝরাতে বেয়াড়া সময়ের উড়ান, তার ওপর ঘণ্টা খানেকের দেরিতে ছাড়ার ঘোষণা মাথা ধরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। শেষে বিমানে যখন উঠে বসতে ডাকল তখন এয়ার হস্টেস-দের ভাবলেশহীন, সুশীতল চাউনি প্রাণ জুড়িয়ে দিল। তবে এ শৈত্যের সঙ্গে হিল স্টেশনের, কিংবা স্বর্গের সমীরণের তুলনা চলে না। বরং বেশ মিল রয়েছে কোল্ড স্টোরেজ, কিংবা মর্গের সঙ্গে। ভাবখানা এরকম যে, তুমি আমার এয়ার লাইনে যাবে কি, যাবে না তাতে কিছুই আসে যায় না। আমরা যে তোমায় নিয়ে যাচ্ছি বর্বর, এই তোমার ভাগ্য ভাল। অবাক কিংবা হতাশ হলাম না। একই রকম নিরুত্তাপ, নির্বিকার ব্যবহার আমি এয়ারোফ্লোটের মস্কো-গামী বিমানেও একবার পেয়েছিলাম। তবে নিরুত্তাপ যে এরকম হাড় হিম করা হতে পারে, তা চায়না-ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স এর অনুগ্রহে জানা হয়ে গেল। মনকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে, মোটে দুঘণ্টার তো মামলা। কলকাতা থেকে কেউ মুম্বই পৌঁছনোর আগেই পৌঁছে যাব ইউনান প্রদেশের রাজধানী খুনমিং (ইংরাজি উচ্চারণে ‘কুনমিং’)। ‘ইউনান’ কথাটা আদপে ইউন নান, অর্থ ‘মেঘ মুলুকের দক্ষিণে’ ( ইংরাজিতে ‘সাউথ অফ দি ক্লাউডস’)। আর তার প্রাণকেন্দ্র খুনমিং কে বলা হয় ‘চির বসন্তের শহর’। ভাবলাম, তার মানে আমাদের সেলিব্রিটি গায়ক অনুপম এই শহরের বাসিন্দা হলে, তাঁর সুপারহিট গানের কলি একটু বদলে লিখতে হত, ‘এসে গেছে’ নয়; বসন্ত ‘থেকে’ গেছে…। এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে চোখ বুজলাম মনকে শান্তি, কিংবা, একান্ত তা না জুটলে, একটু সান্ত্বনা দেব বলে। কিন্তু সে গুড়ে অনেক খানি বালি ঢেলে উচ্চস্বরে আলোচনা চলতে লাগল চারপাশে। ম্যান্ডারিন ভাষায় নয়, শুদ্ধ স্বদেশি হিন্দিতে। বার্মা হাম্প-এর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি, না বড়বাজারে আছি; তা বোঝা যাচ্ছিল না। আর আলোচনার সারমর্ম হল সেই ‘কেত্তো আয়ো, কেত্তো গেয়ো’। প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের অমূল্য বক্তৃতার ‘ফায়দো’-র ব্যাপারটা এবার একটু বোধগম্য হতে থাকল। কলকাতার ব্যবসায়ীরা দল বেঁধে চিন চলেছেন, দর-দস্তুর করে সস্তায় বাজিমাত করতে। দেশে ফিরে সাজিয়ে তুলবেন চাঁদনি, বড়বাজার, কিংবা ফ্যান্সি মার্কেটের দোকান ঘর। ‘ফায়দো’ হবে অনেক। চায়না-ইস্টার্ন এয়ার লাইনের বিমানও কলকাতা থেকে উড়বে রোজ মাঝরাতে। কেবল ভারত-চিন ট্রেড ডেফিসিট বেড়েই চলবে। গত বছরই এই ঘাটতি নাকি ২৪০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। নমো-র মেক ইন ইন্ডিয়া-র ফ্লাইট এখনও টেক অফ করেনি যে!

একেবারে কাকভোর যাকে বলে, অনেকটা ঠিক সেইরকম সময়েই বিমান নামিয়ে দিল খুনমিং। বাইরে বেরিয়ে একটা কাকও দেখতে পেলাম না। তবে দেখলাম হাতে একটা কাগজ ধরে হাঁড়ি মুখ করে একটা লোক আমার দিকে জুলজুল করে বারবার তাকাচ্ছে। কৌতূহল বাড়ল। কাছে গিয়ে দেখি কাগজটায় পোলিও গোছের হাতের লেখায় ইংরাজি হরফে কেউ লিখে রেখেছে ‘মুকেজি’। বুঝলাম এ ব্যক্তি ট্যাক্সিচালক, আর খুঁজছে এই অধম মুখুজ্যে-কেই। আমার দুটো ঝোলা টপাটপ গাড়িতে তুলেই রওনা শহরের দিকে। তালিয়াং শানের পাহাড় গুলো কেমন হবে? কি ইকুইপমেন্ট লাগতে পারে? এসবের কোন ধারণাই না থাকায় বোঝা একটু বেড়েই গিয়েছিল। প্লাস্টিক ক্লাইম্বিং জুতোজোড়া, ক্র্যাম্পন, হেলমেট, আইস এক্স, ওষুধপত্র, স্টোভ এবং একটা কুকিং পটেই ভরে গিয়েছিল একটি স্যাক। অন্যটায় নিজের জামাকাপড় ও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

ঝাঁ চকচকে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়ি মিনিট পঞ্চাশ চলার পর শহরে ঢুকে পড়লাম। সাতসকালে ট্রাফিক কম তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমার গেস্ট হাউস। একটা ডর্মিটরি বিছানা বুক করাই ছিল আগাম। ব্যাগ বস্তা রেখে, দ্রুত চেক ইন সেরে লম্বা হলাম। অবশেষে আমি মেনল্যান্ড চিনে। চোখ বুজতেই প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের বক্তৃতা, নাশি সভ্যতা, চিনশা নদী আর পিটার গোলার্ট; সব কেমন একটা কুয়াশায় যেন মিশে গেল। আমি গভীর ঘুমে ডুবে গেলাম। ঘণ্টা দুয়েক নিশ্চিন্ত নিদ্রার পর বেরিয়ে পড়লাম শহরে। যেতে হবে রেল স্টেশন, কাটতে হবে আগামীকালের লিচিয়াং যাবার টিকিট। গেস্ট হাউসের রিসেপসনে  বসে ছিল একটি কম বয়সী ছেলে। খুব হেল্পফুল আর হাসিখুশি। নাম বলল শিয়াও হাই। বলল, খুনমিং শহরে সবথেকে সস্তায় আর দ্রুত চলাফেরার উপায় হল তিয়ান তং ছ, ওতে চেপেই স্টেশন চলে যাও। তবে দর দাম করতে ভুল না। বিদেশি দেখলেই গলা কেটে দেবার পুরো চান্স। আমি বললাম, বাঃ, এতো আমার দেশের অটো আর ট্যাক্সি ওয়ালার সঙ্গে ভারী মিল। চিনের লোকসংস্কৃতি তো তাহলে একেবারেই অচেনা নয় দেখছি!

‘তিয়ান তং ছ’ বস্তুটি আর কিছুই নয়, একটি ব্যাটারি চালিত স্কুটার। আমাদের দেশেও যেমন পাওয়া যায় ই-বাইক, সেরকমই। পুর্ব আফ্রিকার অনেক শহরেই দেখেছি মোটর বাইক এক ধরনের জনপ্রিয় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। কেনিয়া, তানজানিয়াতে বলে বোডা বোডা। আমাদের দেশের গোয়াতেও একই রকম ব্যাপার হয় শুনেছি। বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত দেখাতেই থেমে যায় একজন। জিজ্ঞাসা করি, তুও সাও চিয়েন? সান শি খুয়েই? থাই খুয়াই ল! অর্থাৎ, কত নেবে? তিরিশ ইউয়েন? অনেক বেশি বলছ ভাই! আর শি? কুড়ি? হাও হাও! বেশ বেশ, চল ভাই। শং লি লাওশি-র ক্লাস কাজ দেয়। হেলমেটের বালাই নেই কারো, না ড্রাইভার, না যাত্রী। শহর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েক হাজার তিয়ান তং ছ। ট্রাফিক এড়াতে এলোমেলো গলি ঘুঁজি দিয়ে চলতে থাকে আমার বাহন। চোখ ধাঁধান রাস্তা ঘাট অদৃশ্য হয়ে যায় হঠাৎ। এ কি একই শহর? ঠিক যেন নাটকের দৃশ্যান্তর। রাস্তায় গর্ত, আবর্জনার স্তুপ, ভাঙাচোরা বাড়ি, চারদিকে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। কলকাতা আর খুনমিং এখানে এক মনে হয়। এই শহর নিয়ে এত বড়াই? তবে বড় রাস্তা এবং তার প্রান্ত জুড়ে শপিং মল আর অট্টালিকার মলাট এত পুরু যে তাকে ভেদ করে শহরের এই রূপ চট করে দেখতে পায়না ঝটিকা সফরে আসা ব্যবসায়ী এবং প্যাকেজ ট্যুরের অতিথি। দেখতে পায়না সেই বাজার যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে আজও বিক্রি হয় বাঘ, ভালুকের চামড়া। বার্মা এবং ভারতের বাঘের বংশ ধ্বংস করে চোরা শিকার চালানোর কারবার চিনের এই সব ব্যবসায়ীর প্রত্যক্ষ মদতে আজও হয়ে চলেছে। তাই আমার মনে হয়, এ যেন ঠিক হীরক রাজার দেশের ভরসা ফুর্তি উৎসবের সাজ। দারিদ্র এবং অন্যায় এর ওপর চরম স্বাছল্যের এক ঝলমলে মুখোশ।

কথাটা কিছুটা ঠিক হলেও শেষ সত্য নয়। আসলে বিগত প্রায় একশো বছর ধরে, গোটা চিন জুড়ে চলছে এক বিপুল রদবদল। পুরনো যা কিছু সব একেবারে ভেঙে ফেলে, বানাও নতুন। এক সময় তাদের মনে হয়েছিল, হেরিটেজ বা উত্তরাধিকার বলে কিছু রাখার প্রয়োজন নেই। তা হতে পারে কোনও প্রাচীন মন্দির, রাজপ্রাসাদ; কিংবা কোনও প্রাচীন দর্শন। শাসকের চোখে পলিটিকালি কারেক্ট নয় যা কিছু তার মূল্য নেই এক বিন্দু। আর যার মূল্য নেই তার টিকে থাকার অধিকারও নেই। অতএব তাকে ধ্বংস করে দেওয়াই ভালো। ১৯১১ থেকে ১৯৩০, এই সময়কে বলা যেতে পারে ‘চিনের নতুন সংস্কৃতির অধ্যায়’। এইসময় থেকেই সমস্ত প্রাচীন সামাজিক মূল্যবোধ এবং দর্শনের উগ্র বিরোধিতা শুরু হয়েছিল চিনে। ঘাড় থেকে পুরাতনকে নামানোর মরিয়া চেষ্টা একেবারে ঘৃণায় পরিণত হয়েছিল।

১৯১১, মাও সে তুং- এর বয়স যখন মাত্র আঠারো, চিনের ২০০০ বছরের প্রাচীন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটল। নতুন এক সরকার গঠিত হল কিন্তু তা নড়বড়ে এবং কথায় কথায় গায়ের জোর ফলাতে সিদ্ধহস্ত। যাকে বলা যেতে পারে ‘মিলিটারিজম’ আর কি? স্বাভাবিক ভাবেই, সেই সরকারের ব্যর্থতা এবং দুর্বলতা সমাজে জন্ম নেবার সুযোগ করে দিচ্ছিল নতুন ধারণার, নতুন আদর্শের, এবং সাহসী আন্দোলনের। এই সময়েই প্যারিস শান্তি আলোচনায়, চিনের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রবল প্রতিবাদ জানাল পেইচিং এর ছাত্ররা। দিনটা ছিল মে মাসের চার তারিখ, ১৯১৯। এটাই ‘মে ফোর্থ আন্দোলন’ নামে পরিচিত। অনেকটা এই মে ফোর্থ- এর সূত্র ধরেই চিন তার নিজের সহস্রাধিক বছরের ঐতিহ্য, এমন কি দর্শনকেও অস্বীকার করেছিল। আক্রমণ তীব্র হয়েছিল মূলত কনফুসিয়াসের শিক্ষার ওপর, কারণ তারই ওপর দাঁড়িয়ে ছিল চিনের প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতেই পারে যে, সেই আক্রমণ থেকে একসময় রবীন্দ্রনাথও রেহাই পাননি। সেদিনের নতুন চিনের কাছে তিনি ছিলেন প্রাচীনপন্থী, সমাজ সংস্কারের পথে এক অতিকায় বাধা। তাই, ১৯২৪-এ সাংহাই গিয়ে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন বিশ্বকবি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেমে থাকেনি চিন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৬, সে অতিক্রম করে আর এক অধ্যায়, লৌহ যবনিকার যুগ। ‘লৌহ যবনিকা’ কথাটা শুনলেই কেবল সোভিয়েত ইউনিয়ন নামটা ভেসে উঠলেও, এ ব্যাপারে চিন পিছিয়ে ছিল না। চিনা জাতিকে আর যাই হোক পাঁচিল তোলা শেখাতে হয়নি কাউকে। গ্রেট ওয়াল ব্যাপারটা ওদের মজ্জাগত যে!  রূপক থেকে বাস্তব, দুই অর্থেই। প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান, দুই ক্ষেত্রেই। কমিউনিস্ট জমানার কড়া পাহারা কিঞ্চিৎ সরে গেলেও আজও আছে এক বিশেষ পাঁচিল। এর নাম ‘দি গ্রেট চাইনিজ ফায়ার ওয়াল’। ইন্টারনেট- এর ওপর খবরদারিই এর কাজ। আজও তাই চিনে ফেসবুক, গুগল, জি-মেল, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া সব নিষিদ্ধ। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের শিয়াও হাই তার সেলফি পোস্ট করবে, আর তার পিছনে খুনমিং এর নোংরা গলি, আবর্জনা খুঁটে খাওয়া ভিখারির ছবি যদি চলে আসে? তাহলে বিশ্বের চোখে চিন কত নীচে নেমে যাবে বলুন তো? পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনিতির মুখ পুড়ে যাবে না বুঝি? আর তাছাড়া এই তো সদ্য ‘আরব স্প্রিং’ এর নামে কি কাণ্ডটাই না হয়ে গেল! একনায়কদের গদি পটাপট উলটে গেল। তাই বিশ্বের সঙ্গে অপরিশোধিত আদান প্রদান চলবে না। তোমার যা মনে আসবে তাই হুট করে বলে বসবে তাই আবার হয় নাকি? সম্প্রতি লু ওয়েই, যিনি চিনের সাইবারস্পেসের ব্যাপারটা দেখেন, ‘টাইম’ পত্রিকায় বলেছেন, ‘ইন্টারনেট হল একটা গাড়ির মত। আর সেই গাড়ি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তার একটা ব্রেক তো দরকার নাকি? আর ব্রেক না থাকলে হাইওয়ে তে উঠলে কি হতে পারে তা কি আর বলে দিতে হবে?’ হীরক রাজার সঙ্গে বেশ মিল, তা কিন্তু মানতেই হবে বলুন?

যাইহোক, ১৯৪৯-এর পর, গোটা বিশ্ব থেকে সে নিজেকে নেয় আড়াল করে। আর তারই মাঝে আসে ‘কালচারাল রেভলিউসন’। ’৬০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সমস্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। দেশ জুড়ে কয়েক লক্ষ লোক মারা যায়। কেবল ইউনানেই ৫ লক্ষ মানুষ গ্রেপ্তার হয় আর তাদের মধ্যে সাত হাজার জনকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়। মুসলিমরাও রক্ষা পায়না। গোটা চিন জুড়ে মসজিদের ওপর হামলা শুরু হয়। তাদেরকে শূকর পালন করতে এবং তার মাংস খেতে বাধ্য করা হয়। এই সময়ে খুনমিং-এর কাছেই শা তিয়েন নামের শহরে একটা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শা তিয়েন ছিল প্রাচীন মুসলিম প্রধান শহর। অনেক শতাব্দী আগে থেকেই, কুবলাই খানের সেনাবাহিনীর বেশ কিছু মানুষ এখানে বংশ পরম্পরায় বসবাস করতে শুরু করেছিলেন।  পরবর্তী সময়ে, বহু মুসলিম বিদ্বান এই শহরেই থাকতেন। এই শা তিয়েন-এই একসময় প্রথম চিনা ভাষায় কোরান অনূদিত হয়েছিল। শা তিয়েন এর মানুষ চিন জুড়ে ‘কালচারাল রেভলিউসন’-এর নামে হান প্রভুত্বকে ফিরিয়ে আনার পৈশাচিক খেলা দেখে সন্ত্রস্ত হন। শহর এবং তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করেন। ঘোষণা করা হয় শা তিয়েন এর স্বতন্ত্রতা কে নষ্ট করা চলবে না। সময়টা ১৯৭৫। পিপলস লিবারেশন আর্মি গোটা শহরটাকে ধ্বংস করে দেয়। কম করে ২০০০ মুসলিম মারা যায়। অনেক পরে এই খবর লৌহ যবনিকা পার হলেও, চিনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানায় না কোনও মুসলিম রাষ্ট্র। আজও, চিনের মুষ্টিমেয় উইগুর মুসলিমদের ওপর চলছে এক অলিখিত হান সন্ত্রাস। তবু অবাক লাগে এই ভেবে যে, কই কোনও মৌলবাদী কট্টরপন্থী সংগঠন তো চিনের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে না? এ কেমন ধর্ম যুদ্ধ? ‘শক্তের ভক্ত, নরমের যম তত্ত্ব’-টাই কি এখানে প্রযোজ্য? না কি ধর্মের নামে লড়াই আসলে একটা তৈলাক্ত রাজনীতি? এখানে ‘তৈল’-শব্দটা আক্ষরিক কিংবা রূপক, যেকোন ভাবেই দেখা যেতে পারে।

১৯১৯ এ যেখানে দাঁড়িয়ে ছাত্ররা গড়ে তুলেছিল মে ফোর্থ আন্দোলন, ১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকে সেই পেইচিং-এই হাজার হাজার মানুষ শুনেছিল চেয়ারম্যান মাও-এর বক্তৃতায় ‘কালচারাল রেভলিউসন’-এর আহ্বান। আর ১৯৮৯-এ, সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন কয়েক হাজার ছাত্র দাবি করছিল গণতন্ত্রের, তখন ট্যাংক এবং মেশিন গান দিয়ে তাদের চুপ করিয়ে দেয় সেই সিসিপি, অর্থাৎ চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি। শা তিয়েন-এর গণহত্যা থেকে তিয়েন আন মেন স্কোয়ার দেখে বারবারই মনে হয় কলকাতার সেই সব দেওয়াল লিখন আর স্লোগানের কথা- ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’! মনে হয়, ভাগ্যিস সেই দিন দেখতে হয়নি আমাদের! সেই চিন আবার আজ বুক ফুলিয়ে বলে, কনফুসিয়ান আদর্শেই তারা তাদের দেশ নেতাদের গড়ে তোলেন। ফলে সেই নেতারা হন আত্মত্যাগী এবং দেশের সেবায় নিবেদিত। তাই তো চিনের এত উন্নতি! ‘চায়না মডেল’ বলে যে কথাটা আজকাল শোনা যায় আকছার, তার মূল স্তম্ভই হল কনফুসিয়ান আদর্শ। মানতে হবে ভাই চৈনিক টুইস্ট। যার কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও এতদিন বলা হল, করাও হল; সেই হাতকেই আবার বসাচ্ছি সোনার সিংহাসনে! ইতিহাসের প্রহসন বোধহয় একেই বলে। এদিকে, ২০১২-তে চিনের লান চৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়। চিনা ভাষায় চিত্রাঙ্গদা, আর তার সমস্ত কুশীলব চিনা। ৮৮ বছর পর রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক হন চিনে। আজ বোধহয় তিনি অবশেষে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ হলেন।

 

 

যাই হোক, তিয়ান তং ছ-এর কল্যাণে, লিচিয়াং এর ট্রেন টিকিট কেটে চলে আসি খুনমিং শহরের প্রাণকেন্দ্রে। পাথরে বাঁধান পরিচ্ছন্ন পথ, একের পর এক আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডের শো-রুম, বিস্তৃত শপিং মল, রেস্তোরাঁ, কাফে, ম্যাকডনাল্ড, কেএফসি, আই-ম্যাক্স সিনেমা কমপ্লেক্স (আর তার বাইরে ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস-৭ এর বিশাল পোস্টার) দেখে আজ খুনমিং এবং ইউনানের বছর ৩০ আগের সংগ্রামের কথা ধারণাও করতে পারা যাবে না। চিনের বয়স্ক মানুষেরা আজ সেইদিনগুলোকে ভুলতে চান, আর নতুন প্রজন্ম সেই দুর্দিন দেখেইনি। তারা কেবল দেখছে আজকের নতুন চিন কে, যেখানে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিরতা এবং অর্থনৈতিক উন্নতি। এমনই এক তরুণ দম্পতির সঙ্গে কাটে সন্ধ্যা। মালবিকা আর এরিক আমায় আমন্ত্রণ জানায় ডিনারে। আমার গেস্ট হাউসের কাছেই এক রেস্তরাঁয় ঢুকে পড়ি আমরা। কলকাতার মেয়ে মালবিকা দিল্লিতে ম্যান্ডারিন ভাষা নিয়ে উচ্চশিক্ষার পর পাড়ি দিয়েছিল ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই আলাপ এরিক-এর সঙ্গে। এখন সুখের সংসার দুজনের। দেখে ভালো লাগে। দে আর লিভিং দি গ্রেট চাইনিজ ড্রিম। আমার মনে হয় আমাদের দুটো দেশেরই অনেক কিছু শেখার আছে এরিক এবং মালবিকার কাছে। খুনমিং-এর একটা গোটা দিন কোথা দিয়ে কেটে যায় বুঝতে পারি না। পরদিন, আবার তিয়ান তং ছ, আবার সেই রেল স্টেশন। এবার রাতের ট্রেন। গন্তব্য লিচিয়াং।

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *