গঙ্গা থেকে চিনশা ৫: নি হাও


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘আপনি চিনের এক লোকাল ট্রেনে চেপেছেন। ঠাসাঠাসি ভিড়। দুই অফিস যাত্রী পাশাপাশি বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। আর সেটা দেখেই যদি আপনার ধারণা হয় দুজন নিশ্চয়ই একই ভাষায় কথা বলেন তা হলেই সেটা হবে একটা মস্ত চৈনিক ভুল’

বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে, এক অভিজাত পাড়ায় একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্ট। সেটাই চিনা ভাষা শেখানোর একটা স্কুল। কলকাতায় আরও কিছু জায়গায় চিনা ভাষা শেখার সুযোগ থাকলেও একমাত্র এই স্কুলটাই বলেছিল তাদের একটা চটজলদি ম্যান্ডারিন বলার কোর্স আছে। ষোলটা ক্লাসে, মোট ৩০ ঘণ্টায় কাজ চালানোর মত ম্যান্ডারিন শিখে ফেলার এই সুযোগ লোভনীয় লাগল। শিক্ষাক্রমের নামও মানানসই- ‘এক্সপ্রেস ট্রাভেলার্স কোর্স’। স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল, জনৈক সরাফ সাহেব তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তিমেতে জানালেন, ‘হামি চাইনিজ জানে না। বোড্ডো কোঠিন ভাষা। ঠিকঠাক শিখতে পানচ বোছোর লাগে। তোবে এটা আজকাল বোহোৎ কামের চিজ। শিখে রাখলে ওদের দেশের সঙ্গে বেওসায় আপনাদের খুব সুবিধা হোবে, ঠিক যেমোন হামার হোচ্ছে’। এই বক্তিমে শুনে আমার খুব আমোদ হল। ভাবলাম, যাক বাবা বেশি খাটাবে না মনে হচ্ছে। ৩০ ঘণ্টার শেষে ‘কেত্তো আয়ো, কেত্তো গেয়ো’ ম্যান্ডারিনে বলতে পারলেই গোল্ড মেডাল বাঁধা। ক্লাসে ঢুকে চক্ষুস্থির। টিচারের চেয়ারে বসে আছে এক জলজ্যান্ত চাইনিজ ছোকরা। এক মুহূর্তের জন্য ভাবলাম, ঠিক দেখছি তো? নেপালি নয় তো? পড়া বলতে না পারলে কুং ফু লাগাবে না তো? কয়েকদিন যেতেই আমার সব দুশ্চিন্তা অবশ্য অমূলক প্রমাণিত হল। ছোকরার সঙ্গে আমার বেশ দোস্তি হয়ে গেল। নাম বলল শং লি। এও বলল, ব্রুস লি, এমন কি জেট লি-র সঙ্গে তার কোনও পারিবারিক সম্বন্ধ নেই, আর সে কুং ফু- ও জানে না। বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে পড়াশুনোয় মন দেওয়া গেল।

যাকে আমরা ‘ম্যান্ডারিন’ নামে জানি তা আসলে চিনের একটি আঞ্চলিক ভাষা। আজ তাকে চিনের রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হলেও মূলত চিনের উত্তর অঞ্চলে বাস করা ‘হান’ সম্প্রদায়ের বুলি এটি। এই জন্য ম্যান্ডারিনের আর একটা নাম হল ‘হান ইয়ু’। হান-রাই চিনের বিপুল ভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায়। চিনের মূল ভূখণ্ডের (মেন ল্যান্ডের) জনসংখ্যার ৯২ শতাংশই হান। তারা চিরকালই নিজেদের সব বিষয়ে পৃথিবীর সর্ব শ্রেষ্ঠ মনে করে। তাই তাদের ভাষাটাই বা ব্যতিক্রম হবে কেন? এর আরও একটি নাম হল ‘পাই হুয়া’। এই ‘পাই হুয়া’ তথা, ‘হান ইয়ু’-কেই ঘসে মেজে নিয়ে আজকের ম্যান্ডারিন। ছিং (ইংরাজিতে বানানটা কিন্তু Qing) সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়ে, সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে, ম্যান্ডারিন ভাষাকে প্রথম সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হয়। শেষ সম্রাট বিদায় নেবার কিছুবছর পর, ১৯২০-র দশক থেকে চিনের  সরকার বাহাদুর দেশ শাসনের সুবিধার জন্য ‘হান ইয়ু’ গোটা দেশ জুড়ে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেন। চিনের ন্যাসনালিস্ট শাসকরা এর নামে দিয়েছিলেন ‘কুও ইয়ু’, অর্থাৎ কি না ‘জাতীয় ভাষা’। পরবর্তী সময়ে, কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর, নাম বদলে হয় ‘ফুথোং হুয়া’, অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের বুলি। তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই ‘হান’, ‘কুও’, ‘ফুথোং’ এর মাঝখানে  ‘ম্যান্ডারিন’ তকমাটা কি করে লেগে গেলো এই ভাষার গায়ে?

‘ম্যান্ডারিন’ শব্দটার প্রয়োগ সম্ভবত প্রথম শোনা যায় ১৫১১ নাগাদ পর্তুগিজরা মালাক্কা দখল নেবার পর থেকেই। এরপর চিন রাজসভায় ‘বেওসা’-র অভিসন্ধিতে ঘুরে বেড়ানো ইওরোপিয়ান দেরও, চিনা রাজকর্মচারি এবং উচ্চপদস্থ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ‘ম্যান্ডারিন’ নামে সম্বোধন করতে লক্ষ্য করা যায়। সেই থেকেই হান-দের ভাষা, মূলত বিদেশিদের কাছে ম্যান্ডারিন নামে পরিচিত হয়ে গেছে। চিন কোনও দিন কোনও ইয়োরোপীয় শক্তির পরাধীন না হলেও, একটা আধা-উপনিবেশ গোছের পরিস্থিতি তাদের কাটাতে হয়েছিল। তাই এই ম্যান্ডারিন তকমাটাও সেই সেমি-কোলনিয়াল অধ্যায়ের অবদান বলা যেতে পারে।

এতক্ষণে নিশ্চয় এটুকু বোঝা গেছে যে ‘হুয়া’ এবং ‘ইয়ু’ দুটো শব্দের অর্থই মোটামুটি ভাবে এক, ভাষা কিংবা বুলি। কি? কেমন চাইনিজ শিখিয়ে দিলাম দেখলেন? শেখা খুব সহজ ভাবছেন তো? একেবারেই ভুল আপনার ধারণা। কেন? মনে করুন, আপনি চিনের এক লোকাল ট্রেনে চেপেছেন। ঠাসাঠাসি ভিড়। দুই অফিস যাত্রী পাশাপাশি বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। আর সেটা দেখেই যদি আপনার ধারণা হয় দুজন নিশ্চয়ই একই ভাষায় কথা বলেন তা হলেই সেটা হবে একটা মস্ত চৈনিক ভুল। কারণ হরফ ( ল্যাটিন বা সংস্কৃত ভাষার মত চিনা ভাষার কোনও অক্ষর বা অ্যালফাবেট নেই। সবই এক ‘ছবি’ এবং ‘লিপি’-র আশ্চর্য সমন্বয়, দুষ্টু ছাত্ররা তাকে ‘ছিপি’ বলে ডাকে।) এক দেখতে হলে কি হবে, অঞ্চল বিশেষে সেই একই অক্ষরের উচ্চারণ, এমন কি অর্থটিও বদলে যাবার সম্পুর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। আর অর্থ বদলে গেলে অনর্থ ঘটতে কতক্ষণ? অনর্থের অর্থ অনেকেরই কাছেই নিতান্তই নিরীহ এবং নিরর্থক হলেও একসময় চিনের সম্রাটদের কাছে এবং পরে চিনের কমিউনিস্ট শাসক গোষ্ঠীর কাছে তা ছিল অনৈক্যের শিকড়।

কিন্তু, সেই শিকড় সমূলে বিনাশ করার এক দীর্ঘমেয়াদি, পদ্ধতিগত কর্মসুচি নিয়েছিল প্রথমে চিয়াং কাই সেক-এর জাতীয়তাবাদী সরকার এবং পরে তা আরও ধারাল করে মাও সে তুং-এর চিন। বলাবাহুল্য, বর্তমান চিন তার তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দক্ষিণ চিন সাগরে বিসর্জন দিলেও, অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত সেই কর্মসুচি আজও সক্রিয়। এই কর্মসুচি কেবল কোনও একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বাক রুদ্ধ করায় সীমাবদ্ধ নেই। আজকের চিনে, তাদের অন্তত দুটি প্রজন্ম কে পিটিয়ে সিধে করে দেবার পর তারা পিতৃপুরুষের নাম না ভুললেও, সংখ্যালঘুদের নিজস্ব মাতৃভাষার আজ আর কোন মূল্য নেই। এখানেই ভাষা দিয়ে একই সূত্রে গেঁথে একটি ‘জাতীয় পরিচয়’ গড়ে তোলার স্লোগানের অন্যপিঠে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে এক চূড়ান্ত জাতিগত বিদ্বেষ এবং নিপীড়নের ছবি। এই ছবির নাম ‘হান ডমিনেসন’, আধুনিক চিনের জাতি-বিদ্বেষের অবতার। হান-রাই যে বাকি চিনা সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তা প্রতিষ্ঠার সবথেকে অনুকূল সময় আজ। সে প্রসঙ্গ বিস্তারিত ভাবে আজ এখানে না তোলাই ভালো, হতে পারে অন্যত্র। তবে, কেবল তিব্বতের দিকে তাকালেই পাঠক আমার বক্তব্য বুঝতে পারবেন এই আশা রাখি।

যাই হোক, সংখ্যালঘুদের কথা বাদ দিয়ে বলা যেতে পারে, এই ম্যান্ডারিন ভাষার গুঁতোয় চিনের বাকি ভাষাগুলোরও নাভিশ্বাস উঠেছে। যেমন ধরুন ক্যান্টনিজ, হাক্কা, কিংবা হোক্কিয়েন-এর কথা। কলকাতায় টিকে থাকা চিনাদের মধ্যে অধিকাংশই তো হাক্কা ভাষায় কথা বলেন। আর তাইওয়ানের এক বিরাট সংখ্যক মানুষ বলেন হোক্কিয়েন। আর এই দুটি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা মেনল্যান্ড চিনেও কম নয়। কুয়াং চৌ (গুয়াং ঝাউ), ফু চিয়েন এবং হংকং অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ অবশ্য ক্যান্টনিজ ভাষায় কথা বলেন। আজ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি, আইন আদালত সমস্ত ক্ষেত্রেই ম্যান্ডারিন আবশ্যিক করে দেওয়ার ফলে তারা সন্ত্রস্ত। চোখের সামনে তিব্বত এবং ইউনানের সংখ্যালঘুদের ভাষা (এবং সেই সঙ্গে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি) প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে দেখে তারা আতঙ্কিত।

আমার তরুণ লাও শি (শিক্ষক) শং লি কিন্তু এসব জেনেও থাকেন  নির্বিকার। শং লি হান। আধুনিক চিনের আদর্শ নাগরিকের চলমান স্পেসিমেন। দুনিয়াকে শেখাব আমাদের রাজভোগ্য ভাষা- সেই মিশন নিয়ে এসে পড়েছেন এই জঘন্য শহরে। পেইচিং (বেইজিং) এর কাছেই তার বাড়ি। চিনা, থুড়ি, হান সভ্যতার অহংকার তার কথায় মাঝে মধ্যেই প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাদের সমাজের সব কিছুই অসাধারণ, ওঠা, বসা, খাওয়া, সঙ্গীত, সাহিত্য, বিজ্ঞান, যুদ্ধ! তারাই বিধাতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এই বঙ্গ সন্তানের তাতে কোনও সমস্যা নেই। অহংকারের পরিধি, তা জাতির হোক বা ব্যক্তির, যতই বিশ্বব্যাপী হোক না কেন, আসলে তা এক গভীর অন্ধকার গহ্বরের সমান। আর সেই গহ্বরে বাস করে আত্মসুখি কূপমণ্ডূকের দল। কিন্তু মণ্ডূক? তারও কি নিস্তার আছে? তাকেও দিব্যি খাওয়া যায়- ভেজে কিংবা সেদ্ধ করে। ব্যাঙ ভাজা তো খাও নি? তাই বুঝি আমাদের কূপমণ্ডূক বলে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে? অতএব, সভ্যতার প্রসঙ্গ বরং শিকেয় তোলা থাক। রেসিপি শিখতে গেলে আবার সেই সভ্যতার শীর্ষে উঠতে হবে যে! তার চেয়ে বরং বলি মুখস্ত বুলি – ‘নি হাও’! মানে হ্যালো! আপনি ভালো তো? রেনশি নি হেন কাও শিং। আলাপ করে খুব ভাল লাগল। ১৬ দিন এবং তাতে ভাগ করা ৩০ ঘণ্টা কেটে যায় দ্রুত। মগজে ছড়িয়ে থাকা ম্যান্ডারিনের টুকরো জোড়া লাগেনা মুখস্থ বিদ্যায়। তবু কাজ চালানোর মত কিছু শব্দ, কিছু সরল বাক্য গঠন, মনকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। মনে ছাপ পড়ে না। পাসপোর্টে ভিসা-র ছাপ লেগে যায়।

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *