গঙ্গা থেকে চিনশা ৪: তালিয়াং শান


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘এমন কি হতে পারে না যে কোন বিদেশি অভিযাত্রী তালিয়াং শানের এই পাহাড়ে না পৌঁছলেও, নতুন চিনের উৎসাহী সরকার বাহাদুর সেখানে হাইওয়ে বানিয়ে ফেলেছে? চিনশা নদীর বিপুল জলস্রোতকে ব্যবহার করে যেরকম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বানানোর ধুম, তাতে সেটা খুব অবিশ্বাস্য কি?’

মনটা পাওয়া কঠিন হবে জানতাম তবে অসম্ভব হবে না, এই বিশ্বাসটুকু ছিল। কিংডন-ওয়ার্ড, জোসেফ রক, পিটার গোলার্ট-এর পরের অধ্যায়ে এ অঞ্চলে এক্সপ্লোরেশন আর হয়েছে কতটুকু? যেটুকু হয়েছে তার সিংহভাগই তামোৎসু নাকামুরার দখলে। মানচিত্র বলছিল, লিচিয়াং এর উত্তরে, ইউনান-সিচুয়ান সীমান্তে চিনশা নদী আবার বাঁক নিয়েছে। এবং এই দ্বিতীয় বাঁক ঠিক সেই শি-কু-র মতই ১৮০ ডিগ্রি। অর্থাৎ, শি-কু থেকে চিনশা প্রথমে তার আর দুই সঙ্গীকে ছেড়ে সটান হয়েছে উত্তরমুখী। তারপর, হাপা এবং ইউলং পাহাড়ের বুক চিরে, টাইগার লিপিং গর্জের গভীর ভিতর দিয়ে বয়ে বেশ কিছুটা পথ গিয়ে ঠিক সিচুয়ান সীমান্তে পৌঁছে আবার নিয়েছে ইউ-টার্ন।  আমার হোম ওয়ার্ক বলছিল, চিনশা-র এই দ্বিতীয় বাঁক নেবার ফলে যে লুপ সে তৈরি করেছে তার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অন্তত দুটি ছোট পাহাড়ের রেঞ্জ। অনুচ্চ, তবু অজ্ঞাত। অনুচ্চ সে তো মানচিত্রই বলে দিচ্ছিল। আর বাস্তবিক অর্থেই অজ্ঞাত কি না তা অনুমান করার জন্য বিরাট কল্পনা শক্তির প্রয়োজন হচ্ছিল না। কিংডন-ওয়ার্ড থেকে নাকামুরা কেউই যে এই অঞ্চলের কোন পাহাড়ে ওঠেননি তা জানা ছিল। পিটার গোলার্ট তাঁর ‘ফরগটেন কিংডম’-এ কেবল বিবরণ দিয়েছিলেন এই অঞ্চলের। এই এলাকাটিকে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ‘তালিয়াং শান’ (‘শান’ কথার অর্থ পাহাড়। এটি একটি পাহাড় অথবা একটি পাহাড় শ্রেণীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।) অঞ্চল নামে। বলেছিলেন, তালিয়াং শান এক পার্বত্য প্রদেশ যা কি না পাঁচশো মাইল দীর্ঘ এবং প্রস্থে প্রায় একশো মাইল। আরও  বলেছিলেন, এই পার্বত্য প্রদেশে বাস করে দুর্ধর্ষ ‘ব্ল্যাক লোলো’ উপজাতি। মূলত এই ব্ল্যাক লোলো-দের ভয়েই এই অঞ্চল মাড়ায়নি শতাব্দী পার করে কৌতূহলী পর্যটক, লাসা-র পথে ঘোড়ার ক্যারাভান নিয়ে চলা ব্যবসায়ী আর লুণ্ঠনকারী দস্যুর দল। তাই তালিয়াং শানের গোটা এলাকা না হলেও কিছু অংশ আজও অজ্ঞাত থাকলেও থাকতে পারে এমন একটা ধারণা আমার মনে দানা বাঁধছিল।

ঠিক এমন সময়েই পরিত্রাতার ভূমিকায় উদয় হলেন আমেরিকান রক ক্লাইম্বার মাইক ডোবি। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে মাইক চীনের অধিবাসী। সময় সুযোগ পেলেই তাঁর কাজ হল নিত্য নতুন রক ক্লাইম্বিং রুট খুঁজে বার করা। সিচুয়ান এবং ইউনানের পরিচিত সব পাহাড়গুলোই তাই তাঁর হাতের মুঠোয়। প্রায়ই সে পৃথিবীকে দিয়ে থাকে চিনের পাহাড়ের নতুন রক রুটের ঠিকানা। মাইক কে জানালাম আমার সংশয়ের কথা। একই সঙ্গে বললাম আমার ‘বামুনের গরু সমস্যা’-র কথাও। জবাব এল। মাইক জানাল, লিচিয়াং এর উত্তরে হাপা শৃঙ্গ ওঠার সময় সে তার উত্তর পুর্ব কোনে, চিনশা নদীর অন্য পাড়ে দেখেছিল এক পাহাড়। পাঠাল তার ল্যাটিচিউড এবং লঙ্গিচিউড। সে আরও বলল, তার মনে হয় না কেউ কোনওদিন তার ধারে কাছে গেছে। উত্তেজিত আমি আবার খুললাম মানচিত্র। বুঝলাম মাইকের দেখা পাহাড় আসলে গোলার্টের তালিয়াং শানের একেবারে উত্তর প্রান্তে। বুঝলাম জগতের কাছে মাইক ডোবির দেখা এই পাহাড় আজও অজ্ঞাত। কৌতূহল আরও বাড়ল। এবার স্মরনাপন্ন হলাম প্রযুক্তির- গুগল আর্থ। গুগল আর্থ-এর স্যাটেলাইট ইমেজারি দেখাল অনেক কিছু, তবে লুকিয়ে রাখল যেন একটু বেশি। লাভের মধ্যে দেখলাম, সেই পাহাড়শ্রেণীর পায়ের তলায় রয়েছে একটা ছোট গ্রাম। সাকুল্যে সাত-আট ঘর হবে। ভাবলাম, অসাধারণ ব্যাপার! তালিয়াং শান-এর এই প্রত্যন্ত গ্রাম কি গ্রাম ব্ল্যাক লোলো-দের? পিটার গোলার্ট-এর বিবরণ অনুযায়ী, তালিয়াং পার্বত্য এলাকাই তো ছিল ব্ল্যাক লোলো-দের নিরাপদ আশ্রয়! এই গ্রামই হতে পারে আমার এবং তালিয়াং শানের যোগসূত্র। কোনও মতে একবার এই গ্রামটায় পৌঁছতে পারলেই কেল্লা ফতে। সেখান থেকে মাইক ডোবি-র দূর দেখে দেখা পাহাড়টায় পৌঁছনো খুব কঠিন হবে না। অতএব মনের মানচিত্রে গন্তব্য স্থির হল। অভিযাত্রীর মায়া পাহাড়ের খোঁজ মিলল। মনে হল, লিচিয়াং শহরের এতো কাছে, মাত্র ১৩০ কিলোমিটারের দূরত্বে এই পাহাড় শ্রেণী হওয়ায়  হয়তো বেশ কম সময় এবং অর্থ খরচ করেই এই অভিযান করে ফেলা সম্ভব।

তবু, প্রশ্ন থেকেই গেল অনেক। যেমন এক, আমি এবং মাইক ডোবি যাকে শূন্যস্থান ভাবছি, তা কি সত্যিই একটা ব্ল্যাংক ইন দ্য ম্যাপ? অর্থাৎ, এমন কি হতে পারে না যে কোন বিদেশি অভিযাত্রী তালিয়াং শানের এই পাহাড়ে না পৌঁছলেও, নতুন চিনের উৎসাহী সরকার বাহাদুর সেখানে হাইওয়ে বানিয়ে ফেলেছে? চিনশা নদীর বিপুল জলস্রোতকে ব্যবহার করে যেরকম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বানানোর ধুম, তাতে সেটা খুব অবিশ্বাস্য কি? দুই, শূন্যস্থান যদি নাই হবে তাহলে তার সম্পর্কে পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত অভিযান পত্রিকাগুলোয় কোনও খবর থাকবে না কেন? তিন, কালচারাল রেভলিউসনের পর থেকে, এক দীর্ঘ সময় ধরে, ঠাণ্ডা মাথায় এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চিন তার সমস্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রায় নিশ্চিহ্ন এবং কোণঠাসা করে দিয়েছে। তালিয়াং শানের ব্ল্যাক লোলো-রা কি তার ব্যতিক্রম হতে পারে? চার, প্রায় দেড় বিলিয়ন জনসংখ্যার এক ঐতিহাসিক ভাবে আগ্রাসী রাষ্ট্রে কোন শূন্যস্থান আজও পড়ে থাকতে পারে কি? পাঁচ, এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের পক্ষে, সম্পূর্ণ একার উদ্যোগে, আধুনিক চিনের টুরিস্ট সার্কিটের বাইরে, এক অজানা গ্রামে পৌঁছে, এক নতুন পাহাড়ের খোঁজ করতে পারা কি আদৌ সম্ভব? ছয়, গ্রামে পৌঁছলেই যে কেউ আমাকে তাদের পাহাড়ে উঠতে দেবে তার গ্যারান্টি কোথায়? সাত, অজানা গ্রামে যদি বা পৌঁছনও যায়, তাহলে কথা বলব কী ভাষায়? এরকম আরও বহু প্রশ্ন হঠাৎই প্রাসঙ্গিক মনে হয়।

প্রথম পাঁচ-ছ’টি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা এবং বিতর্ক চলতে থাকতেই পারে। তবে, আলোচনা এবং বিতর্ক তোলা থাক বিচক্ষণ, তার্কিক, বুদ্ধিজীবীদের জন্য। আমি এটুকুই বুঝলাম যে, সঠিক উত্তর খুঁজে পেতে গেলে অভিযাত্রিকে যেতে হবে ঘটনা স্থলে। নিতে হবে একটা ঝুঁকি। কেবল মনে হল, শেষ প্রশ্নটার উত্তর খোঁজা সম্ভব এই কলকাতায় বসেই। বুঝলাম এবার কিছুদিন মনোযোগী ছাত্র হবার পালা। ভর্তি হলাম দক্ষিণ কলকাতার এক ম্যান্ডারিন ক্লাসে।

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *