গঙ্গা থেকে চিনশা ৩: মায়া পাহাড়ের খোঁজ


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘উত্তর পেলাম ই-মেলের। অভিযানের উপদেশ এবং প্রস্তাব এলো। দমে গেলাম। কারণ, নাকামুরা সান যেমন বললেন তেমনটা যে একেবারেই আমার পক্ষে সম্ভব হবে না তা কলকাতায় বসেই বেশ বুঝতে পারছিলাম’

ক্সপ্লোরেশন-এক একগুঁয়ে খোঁজ। একটা নতুন কিছু খুঁজে বার করার তাগিদ। কেনই বা কিছু নতুন আবিষ্কার করতে হবে? আর করে ফেললেই বা কি আসে যায় সমাজের? তবু বাস্তবে কোনও যুক্তি খুঁজে না পেলেও, আবিষ্কারের আনন্দের নির্যাসের শেষ বিন্দুটুকু গলায় না ঢেলে তার শান্তি নেই। আর আমার কাছে যা নতুন, যা প্রথম, তাও তো একরকম আবিষ্কার! খোঁজ বাহির থেকে মনের জগতে, আনন্দ থেকে অনন্তের। অনেকটা ঠিক সেরকমই একটা তাগিদ আমার মধ্যেও কাজ করছে বেশ অনেক বছর ধরেই। হিমালয়ের অদেখা হিমবাহ আর অজানা গিরিশিরার আনাচে কানাচে আবিষ্কারের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে তাই মাঝমধ্যেই সেই তাগিদ আমায় করছে দেশ পেরিয়ে নিরুদ্দেশ। কখনও এক ইনুইট শিকারির সঙ্গে কায়াক চালিয়ে গ্রিনল্যান্ডের সমুদ্রে সিল শিকার, তো কখনও এক রিভার বুশম্যানের সঙ্গে ওকাভাঙ্গো নদীতে এক ভেলায় ভেসে হিপো-র তাড়া খাওয়া। কখনও একদল রাশিয়ান পর্বতারোহীর সঙ্গে পাহাড় চুড়োয় দৌড় প্রতিযোগিতা, তো কখনও সাইকেল নিয়ে আফ্রিকার অর্ধেক ভূখণ্ড পার।  এমনই অদ্ভুত বেয়াড়া আর খামখেয়ালি এই এক্সপ্লোরেশনের ভূত। সাধে কি আর বলা মায়া পাহাড়ের খোঁজ!

ঠিক তেমনই, সেই খামখেয়ালি একগুঁয়ে খোঁজের ট্র্যাডিশন বজায় রেখেই, ইদানীং আমার মনে হচ্ছিল যদি একবার যাওয়া যেত সেই দেশে, হিমালয়ের নাগাল ঠিক শেষ যেখানে। কাশ্মীর থেকে অরুণাচল প্রদেশ পার হয়ে মায়ানমারের দুর্ভেদ্য জঙ্গলে হিমালয় পর্বতমালা যেখানে শেষ, আজ সেখানে চিনের ইউনান প্রদেশ। ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, মায়ানমারের উত্তর প্রান্তের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, তিব্বতের উচ্চভূমি এবং আধুনিক চিনের ইউনান প্রভিন্সের উত্তরপশ্চিম পাহাড়ি এলাকা একজোট হয়েছে এখানে। ইতিহাসের বিচিত্র উত্থান পতনের সে সাক্ষী। এখানেই, প্রকৃতির এক খামখেয়ালে তিনটি সুবিশাল নদী বয়ে চলেছে খুব কাছাকাছি। পশ্চিম থেকে পুর্বে, মাত্র ১৮০ কিলোমিটারের মধ্যে তিন তিনটে শক্তিশালী নদী। উত্তর থেকে দক্ষিণে, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সমান্তরাল গতিপথে, তাদের নিজস্ব সুগভীর নদীখাত তৈরি করে, বয়ে চলেছে তারা। এশিয়া মহাদেশের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন নদী– নুচিয়াং, লানচাং এবং চিনশা। তিন নদীর সবথেকে পশ্চিমে বয়ে চলা নুচিয়াং মায়ানমারে প্রবেশ করার পর নাম হয়েছে সালউইন, মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। লানচাং, মেকং নাম নিয়ে, ভিয়েতনামের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে দক্ষিণ চীন সাগরে। ৩০০ কিলোমিটার সালউইন এবং মেকং এর পাশাপাশি বয়ে চলার পর কেবল মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চিনশা। হঠাৎই সে বইতে শুরু করেছে পুর্ব দিকে। শেষে সাংহাই-এর কাছে মিশেছে পুর্ব চীন সাগরে। ইতিমধ্যেই তার নাম হয়ে গেছে ইয়াংসি। এই তিনটি নদীর গতিপথকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে তাদের মাঝখানের সুউচ্চ গিরিশিরাগুলো। বেশ কিছু গিরিশিরায় রয়েছে ৬০০০ মিটার উচ্চতার শিখর, হিমবাহ। কোথাও আবার নদীখাত তলিয়েছে ৩০০০ মিটার গভীরে। স্বাভাবিক ভাবেই, এই বিশেষ ভৌগলিক এবং জৈব বৈচিত্রের কারনেই আজ এই তিন সমান্তরাল নদী অঞ্চলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে চিহ্নিত করেছে ইউনেস্কো।

তবে এই তিন সমান্তরাল নদীর দেশের কথা, সেখানে বাস করা মানুষের কথা, তাদের প্রাচীন সাম্রাজ্যের কথা; বিশ্বের মানুষ জানতে পেরেছে বেশি দিন হয়নি। বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেও সে ছিল অজানা। ১৯১১-১৯১৪, বটানিস্ট, অভিযাত্রী কিংডন-ওয়ার্ড কে তিব্বত এবং সাংপো তথা, ব্রহ্মপুত্র নদের এক্সপ্লোরেশনের সমান্তরালে দেখা যায় সালউইন, মেকং নদী সংলগ্ন পর্বতমালায় এবং ইয়াংসি নদীর অববাহিকায়। ফ্র্যাঙ্ক কিংডন-ওয়ার্ড এর এই অভিযান গুলি প্রথমে নতুন প্রজাতির প্রাণী, এবং পরে তা নতুন প্রজাতির গাছপালা এবং ফুল সংগ্রহে মনোযোগ দেয়। তবে এই অঞ্চলের মানুষ, তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের কথা বাইরের দুনিয়ার সামনে উপস্থিত করেন অন্য দুই চরিত্র। তাঁদের একজন হলেন মার্কিন বটানিস্ট জোসেফ রক এবং দ্বিতীয় জন রাশিয়ান ডাক্তার পিটার গোলার্ট।

তিন সমান্তরাল নদীর সবথেকে পুর্বে থাকা নদী চিনশা-র হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে পুর্ব চীন সাগরের দিকে চলে যাবার কথা একটু আগেই বলেছি। শি-কু নামের এক ছোট গ্রামের কাছে সে প্রথম মুখ ফেরায়।একেবারে ১৮০ ডিগ্রি। তিব্বত থেকে একটানা সে বইছিল উত্তর থেকে দক্ষিণে, শি-কু থেকে সে আবার উত্তরমুখী। ফলে আবার প্রবেশ পাহাড়ে, আবার তৈরি গভীর নদীখাত। এখানেই আজকের টুরিস্ট ঠাসা ‘টাইগার লিপিং গর্জ’। রক এবং গোলার্ট, এরা দুজনেই প্রায় একই সময়ে, শি-কু এবং ‘টাইগার লিপিং গর্জ’ এর কাছে, লিচিয়াং নামের এক শহরে দীর্ঘ দিন বাস করেন এবং কাজের সূত্রে সেই শহর কেন্দ্র করে এক বিস্তির্ণ এলাকা ঘুরে দেখেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁদের এক নিবিড় সম্পর্ক। মজার ব্যাপার হল এই দুজনের কারও গায়েই ‘অভিযাত্রী’ তকমা না থাকলেও, মূলত এদের উদ্যোগেই একটা বিশাল অজানা এলাকা থেকে রহস্যের কুয়াশা সরে যায়। মানুষ জানতে পারে নাশি (কেউ কেউ ‘নাখি’-ও বলে থাকেন), মুলি, চোনি, ইউংনিং, তা-লি নামের আশ্চর্য সব সাম্রাজ্যের কথা। আধুনিক চিনের উত্থানের আগেও যারা ছিল স্বাধীন, স্বতন্ত্র। রক এবং গোলার্ট দুজনেই লেখেন হা-পা, লোলো, পাই, মোসুও এবং আরও বিচিত্র বহু উপজাতির কথা। ১৯৩৩ এ, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর এক সাংবাদিককে জোসেফ রক নাশি-দের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ওয়ান অফ দি এক্সট্রা অর্ডিনারি রেসেস অর ট্রাইবস সারভাইভিং ইন দি ওয়ার্ল্ড টুডে’। প্রায় একই সময়ে, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় লিচিয়াং, তার নাশি সাম্রাজ্য এবং জীবনযাত্রা নিয়ে জোসেফ রক-এর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।  এই প্রবন্ধে অনুপ্রাণিত হয়েই জেমস হিলটন লেখেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘লস্ট হরাইজন’। এই উপন্যাসেই হিলটন ‘শাংরি-লা’ কথাটার উদ্ভাবন করেন। ভুলে যাওয়া এক প্রাচীন সাম্রাজ্যে এক ছবির মতো সুন্দর ছোট জনপদ হয়ে ওঠে হিলটনের ‘শাংরি-লা’। বোহেমিয়ান পাশ্চাত্য মননে এক অসাধারণ রোমান্টিকতার ছোঁয়া লাগে। জেমস হিলটনের কল্পনাকে আমেরিকা তার অর্থনীতিতে কোন কাজে লাগাতে পেরেছে কি না জানা নেই, তবে আধুনিক চিন তা করে দেখিয়েছে। তিন সমান্তরাল নদীর উত্তর ঘেঁষে, তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য অঞ্চল তেছেন-এর নাম বদলে সম্প্রতি করা হয়েছে ‘শাংরি-লা’। উদ্দেশ্য আরও বেশি করে পর্যটক টেনে আনা। একসময়ের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ ছেড়ে প্রবল বিক্রমে ধনতান্ত্রিক চিন আজ যে কোন মূল্যে দেশের ভাণ্ডারে ডলার আনতে প্রস্তুত। তবে সে প্রসঙ্গে পরে আশা যাবে। আরও বেশ কিছু বছর পরে, ১৯৪৮-এ প্রকাশিত হয় জোসেফ রক-এর অমূল্য বই, ‘দি এনসিয়েন্ট না-খি কিংডম অফ সাউথ-ওয়েস্ট চায়না’।এই বই আজও লিচিয়াং এবং নাশি সম্প্রদায় সম্পর্কিত সমস্ত গবেষণার মূল স্তম্ভ। কারণ তারপরেই ১৯৪৯ এর ‘কালচারাল রেভলিউসন’ এই অঞ্চলের প্রত্যেক সংখ্যালঘু জনজাতির সংস্কৃতি, ভাষা, অস্তিত্ব সব কিছুকেই প্রায় নির্মূল করে দেয়। সেদিন মাও সে তুং-এর চিন বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য নয়, অবিশ্বাস এবং অবশ্যম্ভাবী ভাঙন দেখতে পায়। তবে এ প্রসঙ্গটাও পরে আরও একটু বিস্তারিত ভাবে আসবে আমি নিশ্চিত। তাই এগিয়ে চলা যাক। ১৯৫৭ তে প্রকাশিত হয় পিটার গোলার্ট-এর বই ‘ফরগটেন কিংডম’। অত্যন্ত সাবলীল এবং আন্তরিক ভাষায় গোলার্ট নাশি সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র লিচিয়াং এ তার জীবনের নয় বছর কাটানোর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন ‘ফরগটেন কিংডম’-এ। এরপরই লৌহ যবনিকার অন্তরালে চলে যায় চিন। আর অবশেষে আজ যে চিন আত্মপ্রকাশ করেছে জগতের সামনে,দম্ভের সঙ্গে আবার খুলে দিয়েছে যে নাশি সাম্রাজ্যের টুরিস্ট সার্কিট, তা যে পুরোটাই মেকি তা বুঝতে বিশ্বের আর বাকি নেই।

তবে দম্ভের সঙ্গে হলেও দরজা তো খুলেছে! এই অঞ্চল দীর্ঘদিন রুদ্ধদ্বার থাকার ফলে কৌতূহল উচ্চমাত্রায় পৌঁছেই ছিল অভিযাত্রী মননে। আর তাই আধুনিক চিন তার সাজানো ‘শাংরি-লা’ এবং তিন সমান্তরাল নদী অঞ্চল থেকে নিষেধাজ্ঞা সরাতেই আবার শুরু হয়েছে এক্সপ্লোরেশন। এই আধুনিক যুগের খোঁজে এগিয়ে আছেন জাপানি অভিযাত্রী তামোৎসু নাকামুরা। তাই সবার প্রথমে আমি যোগাযোগ করলাম নাকামুরা সান-এর সঙ্গে। শুরু হল আমার মায়া পাহাড়ের খোঁজ। উত্তর পেলাম ই-মেলের। অভিযানের উপদেশ এবং প্রস্তাব এলো। দমে গেলাম। কারণ, নাকামুরা সান যেমন বললেন তেমনটা যে একেবারেই আমার পক্ষে সম্ভব হবে না তা কলকাতায় বসেই বেশ বুঝতে পারছিলাম। বৃদ্ধ, অভিজ্ঞ অভিযাত্রী নাকামুরা-র অভাব নেই কৌতূহলের, সাহসের, সময়ের। সর্বোপরি অভাব নেই যে কোনও অভিযানে সবথেকে জরুরি শর্ত– অর্থের। এখনও সেই উনবিংশ শতাব্দীর ধাঁচে অভিযান করেন নাকামুরা সান। প্রথম তিনটির যোগান আমারও আছে, তবে যা নেই তা হল রেস্ত। অতএব, তাঁর কথা মতো এক বিশাল দল নিয়ে, মাল বাহক নিয়ে, দীর্ঘদিন ধরে মেকং এবং চিনশার একাধিক গিরিশিরা পার করে অভিযান চালানো যে আমার পক্ষে অসম্ভব তা বলাই বাহুল্য। অগত্যা ভাবতে বসলাম। ভাবলাম, আমার মায়া পাহাড় কে হতে হবে সেই বামুনের গরুর মতো। অর্থাৎ খাবে কম, দুধ দেবে বেশি। একে দেশটা চিন, তার ওপর সময় কম, অর্থ সীমিত; অথচ অভিযান হতে হবে অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে। বোঝো ঠ্যালা! হাইট অফ অপটিমিসম বোধ হয় একেই বলে।

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *