গঙ্গা থেকে চিনশা ২: মানচিত্রের শূন্যস্থান


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: এমন এক গ্রাম যার বাসিন্দারা আজ কোণঠাসা এক অস্তিত্বের সংগ্রামে এই ‘হান’ প্রভুত্বের যুগে। তবু আজও কয়েকশ মাইল জুড়ে এই চিনশা নদীরই আঁকে বাঁকে টিকে আছে বিচিত্র আদিবাসী গ্রাম, তাদের নিজস্ব ভাষা, রীতি এবং ধর্ম নিয়ে

নীল আকাশটা ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছিল ধূসরে। সকাল থেকে এক এক করে হাজির হওয়া ছেঁড়া পালকের মতো মেঘগুলো কখন যেন একজোট হয়ে গিয়েছে টের পাইনি। ওরা সিরাস। ঝোড়ো হাওয়ার আগাম খবর নিয়ে আসাই ওদের কাজ। দেশ বদলালেও ওদের ভাষা একই থাকে। ওদের সংকেতে তাই ভরসা করা যায়। বলে দেওয়া যায় একটা ঝড় আসছে। তাই পাহাড়ের চুড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আমরা তিনজন দ্রুত নেমে চলার সিদ্ধান্ত নিই। নেমে চলা নিরাপদ, উষ্ণ আশ্রয়ে। আর সেটা জুটে গেলে উপরি পাওনা হিসেবে একটু জল, অল্প খাবার। জীবনের চাহিদা এখানে খুবই সরল। বাকিটা, যেমন স্লিপিং ব্যাগের আরাম, কিংবা আগুনে ঝলসানো কস্তুরি হরিণের মাংস; নেহাতই বোনাস। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা সুখ। তাই নামতে হবে। ফিরতে হবে। ঘণ্টা চারেক হাঁটলেই গ্রাম। এখনই নামা শুরু করলে অন্ধকার হবার আগেই হয়তো গ্রামে পৌঁছে যাব! তবু আরও একবার দাঁড়িয়ে পড়ি। সঙ্গে সঙ্গেই প্রবল শব্দে আপত্তি জানায় হাওয়া। পিঠে যেন হাল্কা একটা ধাক্কা মেরে বলে ‘আবার থামলে কেন?’ আমি আসলে আরও একবার দেখে নিতে চাই। বুকের দ্রুত ওঠানামা শান্ত করে নিতে চাই এক মুহূর্তের পরিতৃপ্ত বিশ্রামে। হঠাৎ হারিয়ে না গিয়ে নীরবে বিদায় জানাতে চাই এই সদ্য  আলাপ হওয়া পাহাড়গুলো আর তাকে বেড় দিয়ে অতল গভীরে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল নদীকে। এতটাই গভীরে সে বয়ে চলেছে যে পাহাড়ের চুড়োয় দাঁড়িয়ে তাকে দেখাই যায় না, কেবল আভাস পাওয়া যায়।

এমন এক নদী, যার জল ছেঁকে এখনও নাকি পাওয়া যায় সোনার ধুলো। তাই চিনশা তার নাম এখানে। পরে আরও উজানে নাম বদলে সে হবে ইয়াংসি। হ্যাঁ, ভূগোলে পড়া চিন দেশের বিখ্যাত নদী হোয়াং হো-র দোসর সেই ইয়াংসি কিয়াং (আসলে উচ্চারন ‘চিয়াং’, যার অর্থ ‘নদী’) । এমন এক গ্রাম যার বাসিন্দারা আজ কোণঠাসা এক অস্তিত্বের সংগ্রামে এই ‘হান’ প্রভুত্বের যুগে। তবু আজও কয়েকশ মাইল জুড়ে এই চিনশা নদীরই আঁকে বাঁকে টিকে আছে বিচিত্র আদিবাসী গ্রাম, তাদের নিজস্ব ভাষা, রীতি এবং ধর্ম নিয়ে। এমন এক পাহাড় যেখানে আমিই প্রথম পথ  খোঁজা পাগল– এক্সপ্লোরার। ক্যামেরায় যা ধরা আছে তা তো থেকেই যাবে। বাড়ি ফিরে বারবার তাঁদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় ফেলাও যাবে। তবু প্রথমবার, নতুন কিছু, নিজের দু’চোখ ভরে দেখা; সে তো একটু আলাদা হবেই। বিশেষ করে যখন গত কয়েক মাস ধরে যে বিন্দুতে পৌঁছনোর কল্পনায় মসগুল ছিলাম আজ সেখানেই দাঁড়িয়ে আমি। ঝড় তুমি আসতেই পার। আমি এখান থেকে নড়ব না। অন্তত আরও কয়েকটা মিনিট আমার একান্ত নিজের।

বেলুড় মঠের গঙ্গার ধারের ছেলে আজ দাঁড়িয়ে আছে চিনশা নদীর দ্বিতীয় বাঁকে, এক অনাবিষ্কৃত পাহাড়ের চুড়ায়। আমার পূর্ব দিক জুড়ে দিগন্তে শুয়ে থাকা পাহাড়গুলো সিচুয়ান প্রদেশের। আর উত্তর পশ্চিম জুড়ে তিব্বত সীমান্তের তেছেন অঞ্চলের কাওয়া কার্পো রেঞ্জ। সিচুয়ান আর কাওয়া কার্পো অঞ্চলের মাঝখানে উঁকি দিচ্ছে রহস্যময় পাহাড় মিনিয়া কোঙ্কা। পশ্চিমে একের পর এক পাহাড়ের শ্রেণী যার ওপারে মায়ানমার। দক্ষিণে হাপা এবং ইউলং পাহাড় যার পায়ের তলায় মাত্র কয়েক শতাব্দী আগেও ছিল এক প্রাচীন সাম্রাজ্য। অনেক দূরের এক রাজ্য সুজলা সুফলা বাংলার সঙ্গে যার ছিল নিয়মিত যোগাযোগ। এক অদৃষ্ট পুর্ব বিন্দুতে কয়েক মুহুর্ত নিশ্চল, নির্বাক, বিস্মিত, রোমাঞ্চিত অভিযাত্রী। এই শতাব্দীতেও তাহলে একটা গোটা পর্বত মালা প্রথম খুঁজে বার করা সম্ভব! স্যাটেলাইট ইমেজারির এই যুগে পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চি হয়ে গেছে মাপা। তোলা হয়ে গেছে তার প্রায় নিখুঁত ছবি। ইন্টারনেটের কল্যাণে সেই ছবি পৌঁছে গেছে পকেটে রাখা স্মার্ট ফোনের পর্দায়। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ তথা ‘জগত জোড়া জাল’-এ ধরা পড়েছে বিশ্ব। ধরা পড়েছে তার ছবি, পরিচয় প্রত্যক্ষ হয়নি। তাই আজও এই গ্রহের কিছু অঞ্চল রয়ে গেছে যাদের সঙ্গে  মানুষের মুখোমুখি পরিচয় ঘটেনি। এরাই ব্ল্যাংকস ইন দি ম্যাপ। মানচিত্রের শূন্যস্থান। এই যুগের এক্সপ্লোরারদের মোক্ষ।

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *