গঙ্গা থেকে চিনশা ১: অভিযানের হদিশ


অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ‘আধসেদ্ধ, আধপোড়া যা জোটে তাই খেয়ে নিতে হয় অমৃত মনে করে। পথ চলতে গিয়ে একটু জিরিয়ে নিই বলে যে বসে, সে নাকি আর ওঠে না। হাওয়ায় নাকি বয় বিষ বাষ্প’

সে এক পুরনো পাহাড়ি গল্প। কোনটা বেশি পুরনো তা আজ বলা কঠিন, পাহাড়টা না তার গল্প। সে এক অনেক দূরের পাহাড়। তখনও চোখে দেখেনি কেউ তাকে । কেবল গল্প শোনা গিয়েছে তার। তাই ধরে নেওয়া যেতেই পারে তার নাম মায়া পাহাড়। সেই সময়ের কথা যখন কেবল জানা গিয়েছে তার নাম, আর শোনা গিয়েছে অদ্ভুত, আজব কিছু গল্প। সেসব গল্প নেহাতই আষাঢ়ে বলে উড়িয়ে দিয়েছে সবাই। তবু ভুলতে পারেনি কেউই। কতদিন লাগে সেই মায়া পাহাড়ে পৌঁছতে? এক মাস, তিন মাস, নাকি পাক্কা সাড়ে চার মাস? সঠিক বলতে পারে না কেউ। অনেক দূরে যে! কে যাবে অতদুর? আর কেনই বা যাবে? কোনটা বেশি জরুরি- পাহাড়, না প্রাণ? তবু একজন নাকি গিয়েছিল। ফিরে আসেনি সে। সবাই বলেছিল, ব্যাটা পাগল! ঠিক হয়েছে। কেবল সে গাঁয়ের বাউল নাকি বলেছিল, না না পাগল হবে কেন? ও গভীর!

মায়া পাহাড় অন্য এক দেশে। আর সেই দেশে পৌঁছতে গেলে পার হতে হয় কত বিচিত্র রাজ্য, মদেশ-প্রদেশ। দড়িতে ঝুলে নাকি পার হতে হয় নদী। পার হতে হয় বরফের মরুভূমি, শুকনো পোড়া পাহাড়। রাত কাটাতে হয় গুহায়। ঠাণ্ডায় রাতভোর ঘুম আসে না। কাঠকুঠো জ্বালিয়ে হাত-পা সেঁকতে হয়। আধসেদ্ধ, আধপোড়া যা জোটে তাই খেয়ে নিতে হয় অমৃত মনে করে। পথ চলতে গিয়ে একটু জিরিয়ে নিই বলে যে বসে, সে নাকি আর ওঠে না। হাওয়ায় নাকি বয় বিষ বাষ্প। এক মাস, তিন মাস,নাকি পাক্কা সাড়ে চার মাস! সময়ের হিসেব নিকেশ হুশ করে উড়ে যায় বাতাসে। ধরে বেঁধে করা মতলব সব এলোমেলো, নির্বিকার হয়ে যায় যাত্রীর। হারিয়ে যায় দেনাপাওনার ফর্দ। অর্থহীন হয়ে যায় জীবনের পরিচিত সংজ্ঞাগুলো। তারপর একদিন হঠাৎ থেমে যায় পথ চলা। চোখ তুলে দেখে সেই গভীর মানুষ। অনেক দূরের সেই মায়া পাহাড় আজ তার সামনে। শোনা কথা, কল্পনা আর স্বপ্নের পর্দাগুলো সরিয়ে বাস্তবের জেগে ওঠার মুহূর্ত এখন। এক মাস, তিন মাস, নাকি পাক্কা সাড়ে চার মাস পর হঠাৎই তার মনে হয় থামলে তো চলে না! মায়া পাহাড় তো দেখা হল। আলাপ পরিচয় হল। কিন্তু তার ওপারটা তো দেখা হয়নি। তাই ফিরে গেলে কি চলে? পরদিন ভোর না হতেই মায়া পাহাড়ের কাঁধ টপকে অদৃশ্য হয়ে যায় সেই লোকটা। বেলা হতেই খোঁজ খোঁজ। তার সঙ্গীরা বলে- পাগল! আপদ গিয়েছে। ছাড় ওকে, আমাদের ঘরে ফিরতে হবে যে!

এদিকে মায়া পাহাড়ের কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে সূর্য ওঠা দেখে সেই গভীর মানুষ। দেখে দিগন্ত আসলে আরও অনেক দূরে। দেখে সামনে আরও বিচিত্র, বিপদের প্রান্তর। পথের চিহ্ন নেই কোথাও। কেমন করে এগোবে ভেবেই পায় না সে। এক অদ্ভুত আনন্দে শিউরে ওঠে সে তবু। তারপর এক মাস, তিন মাস, নাকি পাক্কা সাড়ে চার মাস পর আবার একদিন দেখা যায় তাকে। সেদিন মায়া পাহাড়ের কাঁধে চড়ে আরও এক দুঃসাহসী। সে বলে দেখেছে তাকে। ওই যে দূরে, অজানা এক আবছায়া পাহাড়ের রেখা যেখানে! দূর থেকে দেখে তাকে চিনতে পারে না কেউ। কেবল মুচকি হাসে সেই গভীর মানুষ। হাতছানি ছুড়ে দেয় আকাশে কেবল। অভিযানের হদিশ পায় আর এক অভিযাত্রী।

সেই ট্র্যাডিশন আজও অব্যাহত। মায়া পাহাড়ের অভিযাত্রীরা আজও আছে। সময়ের সরণী বেয়ে এরকমই অনেক গভীর মানুষের, ছুঁড়ে দেওয়া হাতছানি আজও সমান সতেজ। সে হাওয়ায় পাল তুলে নাও ভাষায় আজও কিছু  মানুষ। আরও গভীরে, আরও দূরে যেতে চায় তারা। তাদের বিশ্বাস শেষ হয়ে যায়নি খোঁজ। প্রত্যেকের নিজস্ব মায়া পাহাড়ের খোঁজ। তাই সম্ভাবনার বিচিত্র প্রতিশ্রুতিতে তারা সর্বদাই সজাগ। তাই নিভে যায়নি বিস্ময়। ফুরিয়ে যায়নি অভিযান। রোমাঞ্চের খোঁজে, ব্যর্থতা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি মাথায় রেখেই যখন পথে নামা হয়, তখন সেটা হতেই পারে অ্যাডভেঞ্চার। আর সেই অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে যদি মিশে যায় আবিষ্কারের আনন্দ, তাহলেই উত্তরণ হয় অভিযানে। যাত্রী হয় অভিযাত্রী। জার্নি ইভল্ভস ইনটু এক্সপিডিসন। তবে মাত্র এক শতাব্দী আগেও যার সংজ্ঞা ছিল একটা গোটা মহাদেশ, কিংবা নিদেন পক্ষে একটা দেশের বিস্তৃত অঞ্চলের নাড়ি নক্ষত্র জেনে ফেলা; আজ তা সংকুচিত হয়ে ঠেকেছে শূন্যস্থান পূরণে। মানচিত্রের শূন্যস্থান। তাই বলে রোমাঞ্চ কমেছে কি?

শব্দ ও ছবি: অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাহারা মরুভূমি একা সাইকেলে পার করা সুলেখক অনিন্দ্য একজন অভিযাত্রী। যাঁর অভিযান শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গলে নয়, মানুষের অজ্ঞানতায়ও। সেই অজ্ঞানতার অঞ্চল অভিযানে কখনও অনিন্দ্য়র দেখা হয়েছে ভূগোল বইয়ের সঙ্গে, কখনও অনিন্দ্য পথ হেঁটেছেন নৃতত্ত্বের হাত ধরে, কখনও বা তাঁর সফর সঙ্গী হেয়েছে মাতৃ বা অমাতৃভাষার কোনও সাহিত্য। আজ গ্রিনল্য়ান্ড, কাল চিন, পরশু রাশিয়া ছোটা অনিন্দ্য এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, কোনটা ঘর, আর কোনটা বাইরে। তাই অনিন্দ্য এখনও তালার ব্যবহার জানেন না। তাঁর দরজা সর্বদাই খোলা। চৌকাঠ পেরনোর অপেক্ষায়।

Facebook: Anindya Mukherjee

Twitter: Tuaregraja

Email: anindya.adventuremania@gmail.com

3 thoughts on “গঙ্গা থেকে চিনশা ১: অভিযানের হদিশ

  • June 11, 2018 at 12:25 pm
    Permalink

    পড়ে খুবই ভালো লাগল। এর আগেও আপনার লেখা অনেক পড়েছি।কেনিয়ার চাঁদের পাহাড়ের অনেক গল্প,সাহারায় সীতাহরণ ইত্যাদি আমার পড়া আছে। আপনি সত্যি বাঙালির গর্ব। চালিয়ে যান। ভালো থাকবেন।

    Reply
    • June 14, 2018 at 7:45 pm
      Permalink

      লেখাটি পড়ার এবং তারপর এই মন্তব্য রাখার জন্য অনেক ধন্যবাদ জয়ন্ত বাবু। সত্যিই এতে উৎসাহ পেলাম। ভাল থাকবেন।

      Reply
  • June 11, 2018 at 9:32 pm
    Permalink

    ভুমিকাটি যেন সেই গভীর মানুষ, ডাকছে আয় আয়।।।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *