এ যদি আমার দেশ না হয়…


ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘গ্রামের থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে দাদরির কাটেরা রোডে থাকেন আখলাকের ছোট ভাই জান মহম্মদ। তাঁদের গ্রামের বাড়ি গিয়েছি জানতে পেরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজ নিলেন ভিটের। ধুলোমলিন, তালাবন্ধ, ইট খুলে যাওয়া সেই শৈশবের বাসভূমির। এত কাছে থেকেও তো তিনি এই ক’বছর সেখানে যাননি’

মহম্মদ আখলাক সইফি

কটি ঘটনা ঘটার পর যখন সেই ঘটনার বিশ্লেষণে তামাম সংবাদমাধ্যমের নজর পড়ে, দেশজুড়ে চর্চা হয়, দেশ-বিদেশের রিপোর্টারেরা অকুস্থলে পৌঁছে ঘটনার ছানবিন করেন, তখন তার মধ্যে থেকে খণ্ড সত্য উৎসারিত হয় যা, ওই ‘ইনসিডেন্ট’-এর পুনর্নিমাণে সাহায্য করে। ২০১৫ সালে বাড়িতে গোরুর মাংস রাখার অপরপাধে দাদরির উপকণ্ঠে বিসারা গ্রামে মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে হত্যা করার পরও এমনটা হয়েছিল।

জাতীয় এবং আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের অনেক সাংবাদিক পৌঁছেছিলেন, ছোট্ট গ্রামটিতে ‘সত্য’ উদ্ঘাটনে। এর পর কেটে গিয়েছে তিন-তিনটে বছর। দাদরির ওই ঘটনায় ধুলো জমেছে। এর মধ্যে, যে মতের সমর্থকেরা ওই কাণ্ডটি ঘটিয়েছিল, তারা তাদের ক্যাম্পেন জারি রেখেছে। ভুক্তভুগী পরিবার এবং অভিযুক্ত বাদে মধ্যের যে সম্প্রদায়, ছোট হাইফেনের মতো, তারা এই দুই বিপরীতমুখী শক্তির মধ্যে পড়ে কিঞ্চিৎ দিশেহারা।

যে ভাবে তাঁরা শুরুর দিকে সংবাদমাধ্যম থেকে ঘটনার বিবরণ জানতে পেরেছিলেন, এখন তা পারছেন না, কারণ, বিষয়টি এখন মেইনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যমের কাছে অতীত। এই অতীতের আবার রকম ফের রয়েছে। খুব বেশি ‘অতীত’ হলে, অনেক সময় সংবাদমাধ্যমের নজর পড়ে। ধুলো ঝেড়ে উঠে আসে প্রেত। কিন্তু আখলাক এখনও ততটা পুরেনো নন। সমস্যা এখানেই। আর সেই ফেরে প্রতিনিয়ত নির্মিত হয়ে চলে ওই পরিবার ঘিরে নিত্যনতুন আখ্যান।

সম্প্রতি দাদরি গিয়ে তেমনই এক অভিজ্ঞতা হল। গৌতমবুদ্ধ নগর থেকে দাদরি মেরেকেটে ১০-১২ কিলোমিটার। সূরযপুর থেকে প্রথমে দাদরি স্টেশনের অটো। তার পর রেল গেট পার হয়ে উল্টো দিক থেকে দাদরি বাজারের অটো। এর পর পায়ে হেঁটে জিটি রোড, বাজার পার হয়ে বেশ কিছুটা ভেতরে ঢুকলে বিসরার অটো। প্রবল গ্রীষ্ম এখানে বেশ কিছুটা রুক্ষ। অটোর ভেতর বসে থাকলেও যে গরম হাওয়া আসে, তাতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। রাজধানীর উপকণ্ঠে ছোট্ট শহর দাদরি। নামে শহর হলেও আধাগ্রাম-আধা শহরও বলা চলে। বছর কয়েক আগে শিব নাডর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খোলার সৌজন্যে কিঞ্চিৎ উন্নতি হয়েছে। বাজারটা বেশ জমজমাট।

যে অটোয় সূরযপুর থেকে রওনা দিই, সেখান থেকেই আখলাকের বাড়ি বা ওই ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিক খোঁজ শুরু। শুরুতে সহযাত্রী বা অটোচালেকর কাছ থেকে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি, একমাত্র কোথায় গেলে কোন অটো পাওয়া যাবে, এই তথ্যটুকু ছাড়া।

বিসারা যাওয়ার সময় স্থানীয় এক ব্যক্তিকে আখলাকের বাড়ি যাওয়ার কথা বলতে প্রথমে বললেন, ‘ওখানে গিয়ে কী হবে? ওরা তো কেউ ওখানে থাকে না।’ তবু যেতে চাই, ওঁর বাড়িটা দেখতে চাই। সেই শিবমন্দির, তার লাগোয়া ট্রান্সফর্মার…। ‘কলকাত্তাকা পত্রকার’ এই পরিচয় দেওয়ার পর সেই ব্যক্তি যে উত্তরটা দিলেন, তা বেশ চমকপ্রদ—‘ওই ঘটনার পর ওরা প্রচুর টাকা পেয়েছে। এখন ভালোই আছে।’ তাই, কী করে জানলেন? ওই ব্যক্তির জবাব, ‘আমরা তেমনই শুনেছি।’

কথাটা চমকপ্রদ এই কারণে, যে বছর তিনেক হল আখলাকের স্ত্রী-মা-মেয়ে এবং ছোট ছেলে দানিস, যাঁকে আততায়ীরা মৃত বলে ভুল করে ফেলে রেখে যায়, তাঁরা সবাই বড় ছেলের কাছে নয়াদিল্লিতে। আখলাকের বড় ছেলে ভারতের বায়ুসেনার ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়র। তাঁর কোয়ার্টাসে। দিল্লিতেই ছোট ছেলের মস্তিষ্কে পরের পর অস্ত্রোপচার হয়েছে এই ক’বছরে। আপাতত সে সুস্থ। তবে, পুরো স্বাভাবিক নয়।

আখলাকের বাড়ি

গ্রামেও ঠিক এক ছবি। এক প্রশ্ন। কেন এসেছেন? কী হবে ওই ঘটনার কথা শুনে? সবাই তো সব কিছু জানে। ওরা তো এখন ভালোই আছে। অনেক টাকা পেয়েছে। আশপাশের বাড়িতে গিয়ে প্রশ্ন করতে প্রথমে কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। তার পর কারও বক্তব্য, ‘ঘটনার সময় আমি ছিলাম না।’ কেউ বললেন, অনেক আগেকার ঘটনা, এখন ঠিক অত মনে নেই।’ কারও মুখে ফিরল, এখন ওঁদের ভালো থাকার সেই পুরনো বয়ান। ঘটনার সাক্ষী হয়ে শুধু দাঁড়িয়ে আছে চুন ফেরানো রঙচটা বাড়িটা।

ভেবে দেখুন, স্রেফ গোরুর মাংস আছে, এই বিশ্বাসে একটা লোককে পিটিয়ে খুন করা হল, তার আশি বছর বয়সী মাকে মারা হল, ছোট ছেলেকে মেরে প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় রেখে যাওয়া হল, পরিবারটি গ্রাম ছাড়া হল, পরিবারের পক্ষে আখলাকের ছোট ভাই দাদরি-নিবাসী জান মহম্মদ সইফি এখনও মামলা লড়ছেন, এই তিন বছরে আদালতে চার্জ গঠন পর্যন্ত হয়নি, তাঁরা সরকারি আইনজীবীর খোঁজ পাননি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য এখনও তাঁর পরিবারের উপর প্রবল চাপ—এই খবর আখলাকের ভিটের আমজনতা হয় রাখেন না, অথবা সব জেনে ইচ্ছে করে ভুলে থাকতে চান।

গ্রামের থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে দাদরির কাটেরা রোডে থাকেন আখলাকের ছোট ভাই জান মহম্মদ। তাঁদের গ্রামের বাড়ি গিয়েছি জানতে পেরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজ নিলেন ভিটের। ধুলোমলিন, তালাবন্ধ, ইট খুলে যাওয়া সেই শৈশবের বাসভূমির। এত কাছে থেকেও তো তিনি এই ক’বছর সেখানে যাননি।

ইতিমধ্যে অভিযুক্তরা প্রায় সকলে জামিনে মুক্ত। কয়েকজন অভিযুক্ত ইতিমধ্যে গ্রাম থাকে দাদরিতে এসে তাঁর কাছে অভিযোগ তোলার জন্য দরবার করে গিয়েছে। এখনও তিনি বিচারের আশায় বসে। ভাবছেন, এক দিন না এক দিন সত্য সামনে আসবে। পুরোপুরি নির্দোষ তাঁর ভাইকে যে ভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার জন্য শাস্তি পাবে অভিযুক্তরা।

অথচ, অভিযুক্ত বাদে তাঁর গ্রামের বাকি মানুষের কাছে ঘটনাটা একটা খারাপ স্মৃতি হিসেবে রয়ে গিয়েছে। অনেক টাকা ওই পরিবার পেয়েছে, সে খবর চাউর হয়েছে গাঁয়ে। অথচ, তিন বছরেও যে চার্জ গঠন হয়নি আদালতে, তার খবর সামনে আসে না।
যে রাজনৈতিক দলের সদস্যরা হত্যার সঙ্গে যুক্ত, তারা যে সদা প্রচার চালাবে, এটা প্রত্যাশিত। কিন্তু গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ যখন এমন উদাসীন হয়ে পড়েন এতবড়ো ঘটনার মাত্র বছর তিন পর, তখন তা একটু ভাবায় বইকী।

একই সঙ্গে, বিচারব্যবস্থার এই অভূতপূর্ব শ্লথ গতি ন্যায়বিচারের অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। মাঝখান থেকে জন্ম নেয় পরিবারটির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার গল্প, অর্থ পেয়ে ভালো থাকার কল্প-ছবি। যা ধীরে সঞ্চারিত হয় গ্রামীণ পরিসরে।

ভাবে দেখুন তো, যে মা নিজের চোখের সামনে দেখলেন তাঁর ছেলেকে খুন হতে, নিজে মার খেলেন, নতি কোনওক্রমে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরল, শেষ বয়সে ভিটেমাটি ছেড়ে দিল্লিতে পড়ে থাকতে হল চিরতরে, নিত্য শুনছেন আদালতে কোনও না কোনও কারণে শুনানির দিন পিছনোর কথা, সেই মা, সেই পরিবার কিছুটাকা ক্ষতিপূরণ পেয়ে ঠিক কতটা ভালো থাকতে পারেন?

দেশের এক বায়ুসেনা কর্মীর পরিবারের যদি এই অবস্থা হয় ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে, তবে ‘স্টুপিড কমোন ম্যান’ কী ভাবে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখবে?

শব্দ ও ছবি: ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায়


লেখকের পরিচয়: পেশায় সাংবাদিক ঋতপ্রভ, ভালোবাসেন গল্প বলতে। তবে কল্পনাশ্রয়ী গল্প নয়, অভিজ্ঞতা সূত্রে পাওয়া গল্প। ফুলটাইম পাঠক এবং পার্টটাইম পর্যটক ঋতপ্রভ সেই সব মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পছন্দ করেন, যাঁদের কথা কেউ মনে রাখেনি, কিন্তু মনে রাখলে পৃথিবীর চেহারাটা অন্যরকম হত।

Email: chithi.patro@gmail.com

2 thoughts on “এ যদি আমার দেশ না হয়…

  • June 17, 2018 at 12:36 pm
    Permalink

    সুন্দর প্রতিবেদন।

    Reply
    • June 17, 2018 at 7:11 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *